ব্যক্তিগত গদ্য - শকুন্তলা দে






ব্যক্তিগত গদ্যঃ

আত্মজ
শকুন্তলা দে 



বেশ কিছু দিন ধরেই লক্ষ্য করছিলাম যে বোসবাবু আর ওনার স্ত্রী সব সময়েই বারান্দায়ে বসে আছেন। বেশ বড় বারান্দা সামনে ধারে সুন্দর ফুল গাছের টব দিয়ে সাজান। মাঝখানে বেতের সোফা, সুদৃশ্য টেবিল। এই রকম বারান্দাতে বসে থাকতে তো বেশ ভালো লাগারই কথা। সকালে যখন কাজে বের হচ্ছি তখন দেখি দুজনেই চোখের সামনে খবরের কাগজ নিয়ে বসে আছেন, সামনে চায়ের কাপ। বিকালে বাড়ি ফেরার সময়েও দেখি সেই দুজনেই বসে আছেন। এক জনের হাতে বই তো অন্য জনের দৃষ্টি সেই সাজানো ফুলের টবের দিকে। যেন চোখ আছে তাতে কিন্তু মন অন্য কোথাও। সারা দিনে যতবার বাইরে বেরিয়েছি ততবারই দেখেছি দুজনে সেই একই জায়গাতে বসে। এমন কি নিজেই যখন একটু নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্য রাতে বারান্দাতে দাঁড়িয়েছি, তখনও দেখেছি অন্ধকারে দুজনে বসে আছেন। এইরকম এক দিন ওদের বারান্দায় ওরা, আর আমার বারান্দায় আমি বসে ভাবতে লাগলাম ওদের কথা । আমরা যখন এখানে বাড়ি করে আসি তখন ওনারা দুজনেই সরকারী উচ্চপদে চাকরী করতেন। খুব হাসি খুশী মানুষ ছিলেন। ওনাদের তিন ছেলেই কলকাতার নামী স্কুলে পড়ত। পড়াশোনাতে খুব ভালোও ছিল। বোসগিন্নী কে দেখতাম চাকরী করেও কি সুন্দর ভাবে সংসার সামলাতেন। কাজের লোক তো ছিলই, কিন্তু অনেক কাজ নিজের হাতেই করতে ভালবাসতেন। সব চেয়ে যেটা আমার ভাল লাগতো্ ‌, সেটা হল ছেলেদের প্রতি ওনার নজর। তাদের খাওয়া দাওয়া আচার আচরণের প্রতি খুব সচেতন ছিলেন। নিয়ম করে রোজ সন্ধ্যায় ছেলেদের নিয়ে পড়াতে বসাতেন। প্রতিবেশীদের সাথে যেমন কোন বিরোধ ছিল না, ঠিক তেমন হৃদ্যতাও ছিল না। তবে পূজার সময়েই দেখতাম সবার সাথে দাঁড়িয়ে গল্প করতে। একে একে ছেলেরা সব কৃতী হয়ে উঠল। বলার মতই ছিল তাদের সফলতা। তিন জনেই একে একে বিদেশে পাড়ি দিল, যথা সময়ে বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ী ভাবে থেকে গেল সব। বিদেশে থাকলেও বাবা মায়ের প্রতি নজর ছিল। যখন এখানে আসি তখন ওনাদের বাড়িটা ছিল বেশ সাদামাটা, কিন্তু এখন কি সুন্দর সাজানো গোছান। চারিদিকে যেমন স্বচ্ছলতার ছাপ তেমনি রুচির পরিচয়ও পাওয়া যায়। বেশ কিছুক্ষণ ওনাদের কথা ভাবতে ভাবতে মনটা কেমন যেন ভারাক্রান্ত হয়ে গেল। ঠিক করলাম এর মধ্যে এক দিন নিশ্চয়ই ওনাদের সাথে দেখা করব। দুদিন বাদেই হাতে একটু সময় নিয়ে গেলাম ওনাদের বাড়িতে। আমাকে দেখে খুব খুশী হয়ে যত্ন করে ডেকে নিয়ে বসালেন। বললাম- “চলুন আপনাদের বারান্দাতেই বসি, খুব সুন্দর করে সাজানো আপনাদের বারান্দা।” আসলে খুব জানতে ইচ্ছা করছিল যে ওখানে বসে থাকলে মনের মধ্যে এমন কি কি হয় যার জন্য দিনের বেশীর ভাগ সময়টা ওনারা এখানে কাটান। আমার এই বসার আগ্রহটাই দরজা খুলে দিল ওনার মনের কথা বলার। যা জানার ইচ্ছা নিয়ে এখানে এসেছিলাম তা উনি নিজে থেকেই বলতে শুরু করে দিলেন। বললেন- “এই বারান্দাটাই তো আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে গো।” আমি অবাক হয়ে বললাম- “কি ভাবে ?” উনি শুরু করলেন বলা-“জানেন ছোটবেলা থেকেই নিজেদের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম, তারপর চাকরি, বিয়ে, সংসার সামলানো। তার মধ্যেই ছেলেদের মানুষ করা। তাদের একটা নির্দিষ্ট জীবনে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য দিনের বেশীর ভাগ সময়টাই কাটিয়ে দিতাম। কোনো দিকে তাকানোর সময়ও ছিল না। আর আজ দেখুন অর্থের কোনো অভাব নেই আমাদের। অফুরন্ত সময়, কিন্তু এই বয়েসে শরীরের সেই ক্ষমতা আর নেই যে এই অর্থকে সঠিকভাবে উপভোগ করবো। দেশ বেড়ানোর কতো সখ ছিল কিন্তু চাকরী আর ছেলে মানুষ করার কথা ভেবে কোথাও যেতে পারিনি । আর আজ সব উপায় হাতে নিয়ে বসে আছি কিন্তু শরীর সঙ্গ দিচ্ছে না। মনের সেই জোরও নেই। সারাটা দিন অপেক্ষা করে থাকি ছেলে বউ আর নাতিদের সাথে একটু কথা বলবো বলে। আর এই বারান্দাতে বসে দেখি অন্যান্যদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা । যেন মনে হয়ে ওদের বেঁচে থাকার মধ্যে দিয়েই আমরা বেঁচে আছি।” অনেক দিন পরে একটানা অনেকটা আবেগ উজাড় করে দেওয়ার জন্য মনে হয়ে একটু ক্লান্তি বোধ করছিলেন। তাই একটু সময়ে চুপ করে থেকে বললেন, “জানো আজ মনে হয়ে একটা সন্তানও যদি আমার কুলাঙ্গার হোতো তাহলে কি এমন ক্ষতি হোতো ? অন্তত সে তো থাকতো আমার চোখের সামনে। সারাটা দিনে একবার তো অন্তত মা ডাকটা শুনতে পেতাম, তার জন্য রান্না করতাম, খাবার বেড়ে অপেক্ষা করতাম, দেরী হলে বকতাম, শাসন করতাম, রাগ করে ও চলে গেলে অভিমান করতাম, আবার কাছে ডেকে নিতাম। তাকে নিয়েই সুখে দুঃখে দিন কাটতো।” নীচু স্বরে ধীরে ধীরে কথাগুলো বলতে বলতে উনি থেমে গেলেন। চোখ দুটো অন্ধকারের দিকে স্থির । পাশে বসে বোসবাবুর চোখ দুটিও ওই অন্ধকারে নিস্পলক স্থির। দুজনের স্থির চোখ দেখে মনে হোলো ঐ অন্ধকারে ওনাদের দুজনের কল্পনা এক হয়ে গেছে। যেন সেখানে ওনাদের কল্পনার সেই ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে জল আর মনে এক অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে নিঃশব্দে বেরিয়ে এলাম। সত্যি তো আমরা আমাদের ছেলে মেয়েদের মানুষ করার জন্য জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টা অকৃপণ ভাবে খরচ করি কোনও প্রত্যাশা না রেখে। সেই সব ছেলে মেয়েরা কি কোনো দিন সেই সব কথাগুলো ভাবার সময় পাবে না ? বাবা মা কি সে শান্তি পায় তা ভাববে না ? জানি না কবে সেই দিন আসবে যে দিন সত্যি বাবা মায়েরা তাদের জীবন সায়াহ্নে তাদের মনের মতো করে সন্তানদের কাছে পাবে।


1 মতামত:

  1. সত্যি! কতো দুঃখে পিতা-মাতা আফসোস করে, সন্তান কেন 'কূুলাঙ্গার' হল না?

    উত্তরমুছুন