ধারাবাহিক - সৈয়দা মকসুদা হালিম












ধারাবাহিকঃ

আমার মুক্তি যুদ্ধ - ৬
সৈয়দা মকসুদা হালিম


মিউজিক কলেজের তাহের স্যার মাঝে মাঝে আসেন আমরা কেমন আছি দেখতে। তাঁর মুখেই শুনলাম বারীন’দার খবর। মিউজিক কলেজটা এখন আর্মি ক্যাম্প। বারীন মজুমদার ইলা বউদি-দুই ছেলে মেয়ে মধুমিতা আর জয়কে নিয়ে নদীর ওপারে জিঞ্জিরায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। সঙ্গে কলেজের কিছু ছাত্রও ছিলো। জিঞ্জিরা যেদিন রেড হয় সেদিন কে যে কোথায় যায়, তার ঠিক ছিলো না। আচমকা মিলিটারি বাহিনী নদী পার হয়ে মর্টার, আগুণে বোমায় জিঞ্জিরা পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। সেই মুহূর্তে কে যে কোথায় কোনদিকে পালায়—তা সে নিজেও বলতে পারবে না। এই সময় বারীনদা তাঁর একমাত্র মেয়ে মধুমিতাকে হারান। মধুমিতার বয়স দশ-এগারো বছর। কি যে মায়াবী চেহারা ছিলো! তখন অবস্থা এই রকম ছিলো—আচমকা আক্রান্ত মানুষগুলো দিশেহারা হয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতো। যাবার সময় মা তার কোলের বাচ্চাকে কোলে তুলে নিয়ে জান-প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়াতো। নিরাপদ স্থানে গিয়ে দেখা যেতো যে বাচ্চাটাকে তুলে এনেছে, সেটা তার বাচ্চা না! আবার নৌকায় চড়ে একদল মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছে, সেই সময় মিলিটারিরা দূর থেকে মাঝিকে ডাকতো। সঙ্গে সঙ্গে যাত্রিরা নৌকার পাটাতনের নিচে ঢুকে বসে অথবা শুয়ে থাকতো। মিলিটারিরা অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে নৌকায় উঠে নদী পার হতো। পাটাতনের নিচে যাত্রিরা টুঁ শব্দ করতে সাহস করতো না। কোন শিশুকে কান্নার উপক্রম করতে দেখলেই মা তার সন্তানের নাকমুখ এমন ভাবে চেপে ধরতো যাতে কিছুতেই কোন শব্দ শোনা না যায়। বিশ মিনিট-আধা ঘন্টা পর আর্মিরা চলে গেলে হয়তো দেখা যেতো বাচ্চাটা মরে গেছে! 

এর মধ্যেই একদিন বদরুল এসে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বললো, “ আপা, জগলুল বেঁচে নেই। আগরতলা বন্দী ক্যাম্পে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি। বন্দীর লিস্ট দেখেছি, সেখানে জগলুলের নাম আছে। কিন্তু যে গুদামে বন্দীদের আটকে রাখা হয়েছে, সেখানে সে নাই। আপা, গুদামের কি অবস্থা! এই গরমে ভিতরে মল মুত্রের কিযে দুর্গন্ধ! তার মধ্যেই ছেলেদের ধরে আটকে রেখেছে। কিছুদিন পরপর কয়েকজনকে বের করে নিয়ে যায়, কোন মাঠে বা খাদের পাশে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে। ওদের নির্যাতনের কতো কিছু দেখলাম, বোতলে পানি ভরে সেইটা দিয়ে মারে, মারের শব্দ হয় না কিন্তু যেখানে লাগে সেখানকার মাংস থেতলে যায়। আম্মা কাঁদতে কাঁদতে ফিট হয়ে যাচ্ছেন আর বলছেন, ‘কেনো তাকে আমি যেতে দিলাম, না গেলেতো সে আজো বেঁচে থাকতো!” আর কি করা! আমরা কাঁদতে লাগলাম। জগু—আমাদের জগু দেশের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে শত্রুর নির্যাতনে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে! 

বর্ষার মৌসুমে পাকিস্তানি আর্মিরা দারুণ বে কায়দায় পড়ে যায়। এতো বৃষ্টি আর পানি তারা কখনো দেখে নাই। মূলতঃ পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের সূত্রপাত এই বর্ষা কাল থেকেই শুরু হয়। সারা দেশে মুক্তি বাহিনীর ছেলে মেয়েরা ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু ছেলেরা না, মেয়েরাও এই যুদ্ধে শরীক হয়। মেয়েরা অস্ত্র বহন করে, আহত মুক্তি যোদ্ধাদের সেবা করে আবার মিলিটারি ক্যাম্পে আত্মঘাতী বোমা হামলায় শত্রুর সাথে সাথে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দেয়। মুক্তি বাহিনীকে অস্ত্র শস্ত্র,গোলা বারুদ, রাইফেল মেশিনগান, ভারত ছাড়াও চীন সরবরাহ করে। বড় বড় ভারী যুদ্ধের ট্যাঙ্কগুলো গোলাগুলীতে কিছুই হতো না, একমাত্র ট্যাঙ্কের তল দিয়ে বোমার আঘাতে সেগুলো ধ্বংস হতো। তো-সেই সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধা ছেলে অথবা মেয়ে বুকে বোমার মালা পরে লুকিয়ে থাকতো কাছাকাছি ট্যাঙ্ক এলেই তারা ট্যাঙ্কের তলে ঝাঁপ দিয়ে পড়তো, ট্যাঙ্কের সাথে সাথে নিজেরাও ধ্বংস হয়ে যেতো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সবাই বসে খুব কম ভলিউমে ‘সংবাদ পরিক্রমা’ আর ‘চরমপত্র’ শোনে। একদিন দুলাল রেডিওটার টিউন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কে কি বলে শোনার চেষ্টা করছিলো, হঠাৎ করে একজায়গায় এসে থমকে থামলো! শুনতে পেলো,“ আমি মেজর জিয়া বলছি, কালুর ঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে। বাংলাদেশে স্বাধীন হয়েছে! এর সদরদপ্তর স্থাপন করা হয়েছে ‘ শেখ মুজিবর রহমানকে রাস্ট্রপতি ও তাজুদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মন্ত্রী পরিষদ গঠন করা হয়েছে। শেখ মুজিবর রহমানের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাস্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়েছে!” এরপর আর কিছু নেই। সে কী উত্তেজনা সবার! আরো শুনবো—আরো শুনবো! কিন্তু আরতো নেই। দুলাল পাগলের মতো বিভিন্ন স্টেশন ধরার চেষ্টা করতে লাগলো। সেদিন আর কিছু শোনা গেলো না। স্বাধীন বাংলাদেশ—এই শব্দটা দারুণ উত্তেজনা সৃষ্টি করলো সবার মনে! “মুজিব নগরটা” কোথায় ? আমরা তখনো বুঝতে পারছি না। বেশ রাত করে লাইলী ভাবী আর রশিদ ভাই চলে গেলেন। কিন্তু দুলাল সারা রাত ধরে রেডিওর টিউন ঘুরিয়েই চললো। 

(চলবে)


0 মতামত:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন