রম্যরচনা - নারায়ণ রায়





রম্যরচনাঃ

ঘুষ
নারায়ণ রায়



গত বেশ কিছুদিন যাবত পটাইবাবুর মন মেজাজ তেমন ভাল যাচ্ছে না, কারও সঙ্গে তেমন প্রাণ খুলে কথাই বলতে পারছেন না। তার এ হেন অবস্থা দেখে তার বন্ধু লাটাইবাবুর খুবই খারাপ লাগলো, তাই সেদিন পটাইবাবুকে সরাসরি জিগ্যেস করলেন, “পটাইবাবুকে এমন ম্রিয়মান দেখাবার কারণ কি ?” উত্তরে পটাইবাবু জানালেন, “বড়ই আর্থিক অনটনের মধ্যে আছি লাটাইবাবু, বাড়িতে মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না, আজকাল চিকিৎসায় প্রচুর খরচা, সংসার চালিয়ে সব দিক সামলে ওঠা সত্যি অসম্ভব।” এ কথা শুনে, তাঁর কথায় সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে লাটাইবাবু বললেন, “তা যা বলেছেন, এই তো আমার ছোট ছেলেটার পেটে সামান্য একটু ব্যাথা হ’ল, ডাক্তারবাবু বললেন এক্ষুনি অপারেশন করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে পঞ্চাশ হাজার টাকা গলে গেল। ব্যাঙ্কের জমানো সব টাকাটাই বেরিয়ে গেল। আসলে আপিসে বাড়তি ইনকাম কিছু না থাকলে শুধু মাইনের টাকার উপর ভরসা করে সংসার চালানো এযুগে অসম্ভব।” এ কথা শুনে পটাইবাবু বললেন, “সে সব তো আর আমাদের ভাগ্যে নেই, লাটাইবাবু, তাছাড়া চাকুরীতে এই অতিরিক্ত ইনকাম বলতে আপনি কি বলতে চাইছেন বলুনতো ? ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত ভাবে বলবেন কি ?” কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পটাইবাবু আবার বলে উঠলেন, “আমার ভায়রাভাই আমারই মত একটি সরকারী আপিসে কাজ করেন, আমার চেয়ে কম বেতন পেয়েও তার আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত ভালো কিরূপে হ’ল, তা আমার কাছে কিছুতেই বোধগম্য হয় না। একদিন আমি আমার সহধর্মিনীকে এই কথা জিগ্যেস করায়, তিনি আমায় বললেন, ‘সাধে কি আর বলি আমার বাবা আমাকে একটি গাধার সঙ্গে বিবাহ দিয়েছেন ?’ আচ্ছা লাটাইবাবু, আমাকে কি গাধার মত দেখতে ?”

পটাইবাবুর জীবনের এত দুঃখের কথা শুনে লাটাইবাবুর দুচোখ অশ্রু সজল হ’য়ে উঠল এবং লাটাইবাবু একে একে পটাইবাবুর প্রশ্নগুলির উত্তর ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন- “পটাইবাবু, আপনার দুঃখের কারণ আমার কাছে প্রাঞ্জল হ’ল, এখন আমি একে একে আপনার প্রশ্নগুলির উত্তর দানের চেষ্টা করছি। যেমন প্রথমেই বলি আপনাকে মোটেও গাধার মত দেখতে নয়, আপনি যথেষ্ঠ সুদর্শন, এবার আপনার পূর্বের প্রশ্নের উত্তর দেই, চাকুরিতে ঐ অতিরিক্ত ইনকামকে ‘ঘুষ’ বলে, ঘুষের টাকাগুলিতে আর পাঁচটা টাকার মত মহাত্মা গান্ধীর ছবিই থাকে, কোন চোর বা ডাকাতের ছবি থাকে না, তবে ঐ টাকা সাধারণত বিনা আয়াসে একত্রে বেশ কিছুটা পরিমাণে পাওয়া যায় এবং মানুষও তাই সাধারণত স্বর্ণালঙ্কার, ভ্রমণ এই ধরনের কার্যে এই টাকা খরচা করে থাকে। আরও শুনেছি এই টাকার রং কিঞ্চিত কালো তাই ঐ টাকাকে মানুষ কালো টাকা বলে।” এই পর্যন্ত আলোচনার পর সেদিন সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ার দরুন পটাইবাবু ও লাটাইবাবু যে যার মত নিজ নিজ বাড়ি ফিরে যান। 

আস্তে আস্তে পটাইবাবুর মন কিঞ্চিত স্বাভাবিক হয়েছে, পটাইবাবুও নিয়মিত আপিস যাচ্ছেন। এর দুই চারদিন পর অফিসে বিল বাবু অর্থাৎ সমাদ্দারবাবু, যিনি কিনা ঠিকাদার কিম্বা সরবরাহকারীদের বিল গুলি দেখাশোনা করতেন তিনি এই গরমে সস্ত্রীক কাশ্মীর বেড়াতে যাবার জন্য দুই সপ্তাহ ছুটি নিয়েছেন, এদিকে পুজোয় ঠিকাদারদের বিল পেমেন্ট আটকে যাচ্ছে, তখন বড় সাহেব পটাইবাবুকে অনুরোধ করলেন যে সমাদ্দারবাবুর অনুপস্থিতিতে তিনি যেন বিল ফাইলগুলি প্রসেস করে বড় সাহেবের টেবিলে দিয়ে দেন। সাহেব একথাও বললেন যে তিনি বিলগুলি প্রসেস করে ওনার টেবিলে দেয়া মাত্রই উনি সই করে দেবেন যাতে ঠিকাদারেরা শীঘ্রই পয়সা পেয়ে ষায়। পটাইবাবুর এতদিনের চাকরী জীবনে এই প্রথম বড় সাহেব নিজে ডেকে তাঁকে কোন গুরুত্বপূর্ণ কাজ দিলেন। সাধারণত পটাইবাবুর জন্য নির্ধারিত কাজ হ’ল, চিঠিপত্র রিসিভ ও ডেসপ্যাচ। যাই হোক ফাইলগুলি পটাইবাবুর টেবিলে আসামাত্র তিনি দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করতে শুরু করে দিলেন এবং লক্ষ্য করলেন ইতিমধ্যেই তার ঘরের বাইরে বেশ কয়কজন লোকের ফিসফিস গুনগুন শুরু হয়ে গিয়েছে। 

পটাইবাবু প্রথম ফাইলটি খুলে দেখলেন যে, সেটি তাদের পুরো আপিস বাড়িটি রং করার খরচ বাবদ তিন লক্ষ সত্তর হাজার টাকার একটি বিল। কিন্তু পটাইবাবুর মনে খটকা লাগলো এই ভেবে যে, তাদের তো এই একটিই আপিস এবং গত বিশ বছরে সেখানে কোন রং করা হয়নি তো ? তিনি যখন বিলটি নিয়ে কি করবেন ভাবছেন তখন সুরুৎ করে তার ঘরের দরজা ঠেলে এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকেই তাকে বললেন “নমস্কার স্যার, ওটা আমার ফাইল, বড় সাহেবের সঙ্গে সব কথা হয়ে গেছে, আর আপনি এই খামটা রাখুন স্যার… ওতে তিনহাজার সাতশো টাকা আছে, এই সামান্য কিছু টাকা আপনাকে একটু মিস্টি খাবার জন্য…” এই কথা বলে লোকটি তার হাতদুটি বুকের কাছে জোড় করে হে হে করে হাসতে লাগলো। কিন্তু পটাইবাবু পড়লেন মহা বিপদে, তিনি মনে মনে হিসেব করে দেখলেন যে এখন সন্দেশ বা রসগোল্লার যা দর তাতে ঐ টাকায় প্রায় পাঁচশ পিস সন্দেশ বা রসগোল্লা পাওয়া যাবে। কিন্তু পাঁচশ পিস মিষ্টি তিনি একা খাবেন কি করে ? কিম্বা অফিসের বিল পাস করার জন্য তাকে এত মিষ্টিই বা খেতে হবে কেন ? এ তো তার উপর রীতিমত অত্যাচার, সমাদ্দার বাবুও তো ছুটিতে, তা না হলে তাকে জিগ্যেস করা যেত যে তিনিও কি এই ভাবে এত মিষ্টি খেতেন ?

পটাইবাবু তখনকার মত সংশ্লিষ্ট ফাইলের মধ্যে খামটি রেখে পরের ফাইলটি খুললেন। দ্বিতীয় বিলটি এই আপিসে সমস্ত দরজা জানলা পরিষ্কার করা, নতুন পেলমেট ও নতুন পর্দা লাগানোর খরচা হিসেবে এক লক্ষ আশি হাজার টাকার একটি বিল। কিন্তু এক্ষেত্রেও পটাইবাবু লক্ষ্য করলেন উপরোক্ত কোন কাজই তো হয়নি, তাই সংস্লিষ্ট ঠিকাদারকে ডেকে সেকথা বলতেই তিনিও পটাইবাবুর হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন-“ওসব আপনাকে চিন্তা করতে হবে না স্যার, বড় সাহেবের সঙ্গে কথা হয়ে গেছে, আপনি শুধু ক্যালকুলেশনটা চেক করে সাহেবের টেবিলে দিলেই উনি সই করে দেবেন, আর এইটা রাখুন স্যার এতে আপনার সিগারেট খাওয়ার জন্য এক হাজার আটশো টাকা আছে।” এমনিতেই পাঁচশো পিস মিষ্টির কথাটা মাথায় ঘুরছিল তার সঙ্গে সিগারেটের কথা শুনে পটাইবাবুর মেজাজটা আরও তিরিক্ষি হয়ে গেল। পটাইবাবু ধূমপান করেন না, তা সত্বেও একটা হিসাব করে ফেললেন। মোটামুটি একটা ভালো সিগারেটের দাম যদি আট টাকা হয় তাহলে একহাজার আটশো টাকায় দুইশো পঁচিশটি সিগারেট পাওয়া যাবে। কিন্তু একজন লোক বাইশ-তেইশ প্যাকেট সিগারেট একদিনে খাবে কেমন করে সেই চিন্তায় পটাইবাবুর শরীর আবার খারাপ হতে শুরু করল। সমাদ্দার বাবু সারাদিনে অনেকগুলি সিগারেট খান, তাকে জিগ্যেস করলে এর সদুত্তর পাওয়া যেত, কিন্তু তিনি ছুটি নিয়েছেন বলেই তো যত সমস্যা। পাঁচশো পিস মিষ্টি ও দুইশো পঁচিশ পিস সিগারেটের ধোঁয়ায় পটাইবাবুর যখন বিভ্রান্ত তখন ঠিক করলেন আপাতত এই ফাইলটাও থাক, দেখা যাক পরেরটাতে কি আছে ? এই কথা বলে তিনি সংশ্লিষ্ট ফাইলের ভিতর টাকার খামটি রেখে সেটিকে একপাশে রেখে দিলেন। এবর তিনি তিন নম্বর ফাইলটিকে খুললেন।

এই বিলটিতে আপিসের বাথরুমগুলি মেরামতের কাজ দেখানো হয়েছে, বাথরুমের মেঝে ও দেয়ালে টালি লাগানো, কমোড, বেসিন ইত্যাদি পাল্টানো, জলের কল ও পাইপ সারানো ইত্যাদি কাজ হিসেবে এক লক্ষ ষাট হাজার টাকার একটি বিল জমা দেয়া হয়েছে। এবার পটাইবাবুর সত্য সত্যই অজ্ঞান হয়ে যাবার মত অবস্থা কারণ ইতিপূর্বে দুইটি বিল দেখার পর যখন তার শরীরটা বেশ খারাপ লাগছিল তখন চোখে মুখে একটু জল দেবার জন্য বাথরুমে গিয়ে বাথরুমের ভঙ্গুর দৈনদশা দেখে তিনি কোনক্রমে কাজ সেরে চলে আসেন। পটাইবাবু দুগালে হাত দিয়ে যখন এসব কথা ভাবছেন ঠিক তখনই ঐ কাজটির ঠিকাদার সটান তার ঘরে ঢুকে তার হাতে একটি খাম দিয়ে বলল, “স্যার, বড় সাহেবের সঙ্গে সব কথা হয়ে গেছে স্যার, আপনি এই খামটি রাখুন, এতে আপনার চা খাওয়ার জন্য এক হাজার ছয়শো টাকা আছে।” এতক্ষণ তবু পটাইবাবু মাথাটা সোজা করে বসে ছিলেন কিন্ত এক কাপ চায়ের দাম চার টাকা ধরলে চারশো কাপ চা খেতে হবে শুনে ওনার মাথাটা ঘুরে গেল। পাঁচশো পিস মিষ্টি, দুইশো পঁচিশ পিস সিগারেট ও চারশো কাপ চা কিভাবে খাবেন তিনি ? কারণ তাকে এখন অনেকদিন বাঁচতে হবে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে পটাইবাবু অজ্ঞান হয়ে গেলেন। অবশ্য দু-চার মিনিটের মধ্যেই তিনি সম্বিত ফিরে পেলেন। ঠিক এই সময়ে পটাইবাবুর কি করা উচিৎ তা বুঝতে না পেরে তিনি সকল বিল ফাইল ও টাকার খামগুলি নিয়ে বড় সাহেবের ঘরে ঢুকে তাঁর টেবিলে রেখে ধপাস করে সামনের একটা চেয়ারে বসে পড়লেন। তারপর বড়সাহেবের টেবিলে মাথা রেখে চিৎকার করে বলে উঠলেন, “স্যার, আমাকে বাঁচান, আমার অসুস্থ বৃদ্ধা মা, অবিবাহিতা কন্যা এবং বেকার পুত্রের জন্য আমি বাঁচতে চাই , আমি বাঁচতে চাই, আমি বাঁচতে চাই” একথা বলে পটাইবাবু হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন। ইতিমধ্যে বড়সাহেবের ঘরের ভিতরে ও বাইরে কৌতুহলী সহকর্মীদর ভীড় জমে গেছে। সবাই আলোচনা করে সাব্যস্ত করলেন যে পটাইবাবুর শরীর খুবই অসুস্থ, ওনার বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন। তবে আপাতত পটাইবাবুকে কয়েকদিন ছুটি দিয়ে বাড়ি পৌছে দেয়া হবে। সেইমত আপিসের একটি গাড়িতে পটাইবাবুকে তার বাড়ি পৌছে দেওয়া হ’ল। ওদিকে পটাইবাবুর অর্ধাঙ্গিনী সুরবালা তার স্বামীকে এইভাবে বাড়ি ফিরতে দেখে যার-পর-নাই আতঙ্কিত হয়ে উঠলেন। পরে সব কথা শুনে আপিসের সহকর্মীরা বিদায় নেবার পর নিজের শরীরকে যতটা সম্ভব উচ্চ মার্গে তুলে এবং গলার স্বর উচ্চগ্রামে তুলে শুধু একটা কথাই বললেন “সাধে কি আর বলি, আমার বাবা আমাকে একটি গাধার সঙ্গে বিবাহ দিয়েছেন।।”


0 মতামত:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন