প্রচ্ছদ নিবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রচ্ছদ নিবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

প্রচ্ছদ নিবন্ধঃ সীমা ব্যানার্জ্জী-রায়

















প্রচ্ছদ নিবন্ধঃ


ভারতের রাজপুত্র স্বামী বিবেকানন্দ
সীমা ব্যানার্জ্জী-রায় , গার্লল্যান্ড , টেক্সাস 


১

“পথ হতে গেঁথে এনেছি সিক্তযূথীর মালা, সকরুণ নিবেদনের গন্ধ ঢালা-” 

আমরা অনেক কিছু জানি বা অনেক কিছু জানি না -এই দুই মতের বিরুদ্ধে গেলে একশত ভাগের দশ ভাগ হয়ত আমরা তাঁর সম্বন্ধে জানতে পেরেছি, বা জানবার চেষ্টা করেছি তাই না? 

তিনিই একজন ভারতীয় যিনি শুধু ধর্মই প্রচার করেন নি, তিনি আমাদের রীতি নীতি আচার ব্যাবহারের বৈশিষ্ঠ ও ঐতিহ্য তুলে ধরেছিলেন প্রাশ্চাত্যের বিভিন্ন মানুষের সামনে। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে তিনি কি খাদ্যও প্রচার করেছিলেন? অথবা তিনি কি খাদ্যরসিক ছিলেন? 

আমার স্বল্প জ্ঞানে তা হলোঃ তিনি প্রাশ্চাত্যে বেদান্ত এবং বিরিয়ানী তার সাথে চা-এর প্রচার করেছিলেন। চা যে শরীরের পক্ষে উপকারী তা তিনি স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ভালবাসতেন জিঘেবাগাস, সুইটমিট এবং খিচুড়ি, নলেন গুড়ের সন্দেশ, শুক্তো, মোচার ডালনা, ইলিশ মাছ, চকলেট আইসক্রিম, ভারতীয় পালং শাক ও পুঁইশাকের চচ্চড়ি, ছোলার ডালের সাথে গরম লুচি, চানাচুর, জীবে গজা, ঝাল করে রান্না ঝিনুক। তাঁর কথায় আমরা জানতে পারিঃ 

“তোমরা অন্যদের মানুষ হয়ে ওঠার জন্য প্রচার করে বেড়াও, কিন্তু তাদের সুখাদ্য দিতে পারো না। গত চার বছর ধরে আমি এই সমস্যাটি নিয়ে ভাবছি। গম থেকে এক ধরণের মোটা চাল তৈরিই করা যায় কিনা সে বিষয়ে নিরীক্ষা করার ইচ্ছে আছে। পানীয় জলের ক্ষেত্রে, আমাদের দেশে লাগে- এমন একটি বিশোষক যন্ত্রের খোঁজ করেছি। আমি একটি বাটির মত চীনামাটির পাত্র দেখেছিলাম আর তার মধ্য দিয়ে জল নিষ্কাশন করা হচ্ছে ও জীবাণুগুলি সেই বাটিতে রয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ক্রমে ঐ জল -বিশোষক বাটিটিই সমস্ত জীবাণুর কেন্দ্রস্থল হয়ে যাবে। সকল বিশোষক যন্ত্রের ক্ষেত্রেই একই বিপদ। অনেক অনুসন্ধানের পর আমি একটি পদ্ধতি আবিষ্কার করি জল পরিশোধনের পর অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। এই পদ্ধতির প্রয়োগে জল এত বিশুদ্ধ হচ্ছে যে নিঃসন্দেহে সেই জলের ব্যবহারে স্বাস্থ্যের প্রভূত উন্নতি সম্ভব।” 

খেতরি বাসকালে একটি সভায় ব্যবহারিক ভারতীয় জীবনে হিন্দুধর্মের শোচনীয় অবস্থা দেখে তিনি ব্যথিত হন। এই প্রসংগে তিনি বলেন- “ আমরা হিন্দু নই, আমরা বৈ্দান্তিক ও নই-আমরা ছুঁৎমার্গীর দল। রান্না ঘর হল আমাদের মন্দির, ভাতের হাঁড়ি উপাস্য দেবতা আর দুখানা মন্ত্র'- সমাজের এই অন্ধ কুসংস্কার সত্বর দূর করা প্রয়োজন।”

মঠ-মিশন প্রতিষ্ঠার আগে কম বয়সী নরেনের সাংঘঠনিক শক্তির প্রথম প্রকাশ দেখা গিয়েছে এই রান্নার ক্ষেত্রেই। নরনারায়নের সেবার প্রাথমিক পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে এক অভাবনীয় প্রতিষ্ঠান 'গ্রিডি ক্লাব' সংগঠন, যার বাংলা মহেন্দ্রনাথ করেছেন “পেটুক সঙ্ঘ'। উদ্দেশ্য ছিল- কেবল ভোজ়ন নয়, সেই সঙ্গে রান্না নিয়ে রীতিমত রিসার্চ। প্রতিষ্ঠার দৃষ্টি সারা বিশ্বের দিকে প্রসারিত। ভবিষ্যতের বিশ্ববিবেক এই সময় পুরনো বইওয়ালার কাছ থেকে খন্ডে খন্ডে বিভক্ত ফেঞ্চ রান্নার বই কিনতে আরম্ভ করেছেন। যে ফরাসী জাত অর্ধসভ্য ইউরোপকে ভদ্রভাবে রান্না বান্না করে খেতেদেতে শিখিয়েছে, যে ফরাসীজাত ও সভ্যতার গুণগানে সন্নাসী বিবেকানন্দ একদিন মুখর হয়েছিলেন, তার আদিতে কমবয়সের -ফ্রেঞ্চকুকিং- এর সাধনা। 

~ আবিষ্কার ~ হাঁসের ডিম খুব ফেটিয়ে চালে মাখিয়ে কড়াইশুঁটি ও আলু দিয়ে ভুনি-খিচুড়ি। পলোয়ার চেয়ে এই রান্না যে অনেক উপাদেয় বহু বছর পরেও বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেছেন। বাবা রাঁধতেন কালিয়া এবং পলোয়া, আর সুযোগ্যপুত্র আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে নতুন ডিশের মাধ্যমে পূর্বপশ্চিমকে একাকার করে দিলেন। প্যারিস রাজধানীর একটি বিখ্যাত স্যুপ-এর রেসিপি তিনি দিয়েছিলেনঃ “কচি কলাইশুটি খুব সিদ্ধ করে, তারপর তাকে পিষে জলের সাথে মিশিয়ে ফেল। একটা দুধ ছাঁকনির মতো তারের ছাঁকনিতে ছাঁকলেই খোসাগুলো বেরিয়ে আসবে। এখন হলুদ, ধনে, জি্রে, মরিচ, লঙ্কা, যা দেবার দিয়ে সাঁতলে নাও-উত্তম সুস্বাদু সুপাচ্য ডাল হল। যদি পাঁঠার মুড়ি বা মাছের মুড়ি তার সংগে থাকে তো উপাদেয় হয়।” তাঁর সব কথার মধ্যেই দেখতে পাই সব কিছুর তুলনা করা হয়েছে কিছু না কিছু খাদ্য জাতীয় শব্দের মাধ্যমে। এইভাবে কি সুন্দর ভাবে তিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন আপামর বিদেশী জনগোষ্ঠীর মধ্যে, আর আমাদের হিন্দুধর্মকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 

তাঁর সমস্ত চিঠিপত্র খুঁটিয়ে দেখলে দেখতে পাওয়া যায় -

(মিঃ ই.টি.শটার্ডিকে লেখা)- 
“আমার প্রতি খুবই দয়াপরবশ হয়ে জাহাজের পার্সার আমাকে একলা একটি কেবিন ছেড়ে দিয়েছেন। খাবার নিয়েই যা একমাত্র অসুবিধা- মাংস আর মাংস। কেবল মাংস। আজ অবশ্য কিছু সবজী দেবে কথা দিয়েছে।” 

(মিস মেরী হ্যালেকে লেখা)-
“আমি একটা আলপিন নই যে শস্যের বোঝার নীচে হারিয়ে যাব। কাল রাত্রিবেলা আমি একটি খাবার তৈ্রী করেছিলাম। জাফরান, ল্যাভেন্ডার, জৈত্রী, জায়ফল, কাবাবচিনি, দারুচিনি, লবং, এলাচ, ক্রীম, লাইমজুস। পিঁয়াজ, মনাক্কা, বাদাম, মরিচ এবং চাল- সব মিলিয়ে কী উপাদেয় পাঁচমিশালী, নিজেও একটু খেতে পারি নি। হিঙ্গ অবশ্য ছিল না, থাকলে গিলবার পক্ষে সুবিধা হত যদিও”।

এর থেকে বোঝা যায় তিনি গরম মশলাও কিভাবে করে-বিদেশীদের সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। 


২ 

তাঁর এই অসাধারণ বক্তব্যে আমরা কিছুটা আঁচ করি যে আমরা যে লোভী তার সমাধানের পথ ও তিনি বলে দিয়ে গেছেন- 
“একটি দম্পতির কথা জানি, স্বামী স্ত্রীরূপে পরিণত হবার পক্ষে তদের সব কিছুই অনুকূল ছিল, শুধু কনের বাবা এই বলে হেঁকে বসলেন, যে পাত্র অন্ততঃ দশলাখপতি না হবে তাকে তিনি কন্যা সম্প্রদান করবেন না। ছেলেটি আর মেয়েটি নৈরাশ্যে ভেঙে পড়ে, এমন সময় দেখা দিল এক চতুর ঘটক। সে বরকে গিয়ে বল্লে দশ লাখের বদলে সে তার নাকটি দিতে প্রস্তুত কিনা। বর বললে, না। কনের বাবার কাছে গিয়ে তখন ঘটক বললে, এমন সব জিনিসের মজুত আছে তার মূল্য কয়েক কোটি; বিবাহ পাকা হয়ে গেল! তুমি যেন এরকম 'কোটি' গ্রহণ কোরো না। 

তাহলেই দেখো, তুমিও লাখপতি জোগাড় করতে পারলে না, আমিও টাকা পেলুম না। অতএব আমার দুশ্চিন্তা হল প্রচুর। বহু পরিশ্রম করতে হল বৃথাই; তাই রোগে ধরল। আমার মতো মগজ চাই আসল কারণ খুঁজে বার করতে -নিজের প্রতি নিজেই মোহিত হয়ে যাচ্ছি। ব্যাপারটা ঘটেছে এই দক্ষিণ ভারতেই; লন্ডন থেকে ফিরবার পর এখানকার লোকেরা আমাকে প্রচুর খাওয়াতে লাগল, ভোজ দিতে লাগল আর আমার কাছ থেকে যত পারে কাজ আদায় করে নিতে লাগল। আমরা সাত সমুদ্রে বিশ্বাস করি-এক দুধের সাগর, এক মধুর, এক দধির, এক সুরায়, এক আখের রসের, এক লবণের, আর একটা যেন কী ভুলে গেছি।” 

(স্বামী ব্রহ্মানন্দকে লেখা)-
“দেখতেই পাচ্ছো এখন আমি যাত্রাপথে। কলকাতায় কমলালেবু পাওয়া গেলে শ'খানেক মাদ্রাজে আলাসিঙ্গার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়ো, যাতে মাদ্রাজে পৌঁছে আমি তা পাই। তুমি সমালোচনা বন্ধ করেছো; তা নইলে এর মধ্যে আরো ঠান্ডা কোনো যায়গায় চলে যেতাম-আর কিছু না হলেও মজা করার জন্য। তুমি কি সত্যি ওসব মূর্খের কথা শুনে চলো? এ যেন আমাকে তোমার কলাই ডাল খেতে না দেওয়া-ওতে শ্বেতসার আছে বলে! আরো কত -ভাত বা রুটি সেঁকে নিয়ে খেলে নাকি শ্বে্তসার থাকবে না! কি অসাধারণ জ্ঞান বৎস। রাত্রির খাবার টা খুব হালকা করে নেব ভাবছি । সকালে দুপুরে পেট বোঝাই করে খাব। রাতে শুধু দুধ , ফল ইত্যাদি। তাই তো এই ফল বাগিচায় আছি “ফলের আশায়”! বুঝতে পারো না?”
-কি অদ্ভুত তুলনা। 

তাঁর লেখা চিঠিপত্র থেকে আমরা জানতে পারি এত ব্যস্ততা সত্বেও তিনি কিভাবে সবার সাথে যোগাযোগ রাখতেন। আমাদের শিখিয়ে গেছেন কিভাবে অন্য কাজকর্মের সাথেও খাদ্য-এর প্রয়োজনীয়তা আমাদের শরীরে ও মনে। 

(মারী হালবয়স্টারকে লেখা)- 
“ইউরোপে যাওয়া মানেই ত কাজ, তাই নয়? না কাজ, না রুটি। এখানে হলদে কাপড় যথেষ্ট, খাদ্যও পাব পর্য্যপ্ত। যেভাবেই হোক বহু আকাঙ্খিত বিশ্রামটি পাচ্ছি, আশা করি তা আমার শরীরের পক্ষে ভালো হবে। বেশ কয়েকটা বছরের জন্য ভালো রকমের বিশ্রাম, কোনো কাজ নয়-এরকমটা ইচ্ছে করে না তোমার? ঘুম আর খাওয়া আর ব্যায়াম; ব্যায়াম, খাওয়া আর ঘুম-আরো কয়েকমাস আমার এই রকমই চলবে। 

খুব ঘোড়ায় চাপা এবং ব্যায়াম চালিয়েছি , কিন্তু ডাক্তারের প্রেস্ক্রিপ্সন অনুসারে প্রচুর মাখন তোলা দুধ খেতে হয়েছে, ফলে পিঠের চেয়ে পেট মোটা হয়েছে বেশী। সামনের দিকটা আমার বরাবরই কিছু বেশী কিন্তু এক্ষুনি আর তা বাড়াতে চাই না-তাই দুধ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি। তোমার আহারে রুচি এসেছে জেনে খুব খুশী হলাম। হ্যাঁ ভালো কথা, আমি দারুণ খুশী -অতি তাড়াতাড়ি বুড়ো হচ্ছি, চুল পাকতে লেগেছে। “সোনালীর মধ্যে রুপোলী সূত্র”- মানে কালোর মধ্যে আর কি- দ্রুত বাড়ছে। ধর্ম্প্রচারকদের পক্ষে যুবাপুরুষ হওয়া ভালো নয় , তাই না? আমার তো তাই মনে হয়, সর্বদাই মনে হয়েছে। বৃ্দ্ধদের ওপর লোকের বিশ্বাস বেশি হয়, আর অনেক বেশী শ্রদ্ধাস্পদ লাগে। তথাপি বুড়ো বদমায়েসরাই দুনিয়ায় সব চেয়ে বড় বজ্জাত, তাই নয়?”


৩

অসাধারণ মজার মানুষ ছিলেন আমাদের রাজপুত্র বিবেক ও আনন্দ। বিদেশে তাঁকে অনেক নামে ডাকা হতো তার মধ্যে বিবেক ও আনন্দ নামটাই বেশি পরিচিত ছিল সবার কাছে। 

(সিস্টার নিবেদিতাকে লেখা)- 
“আমি দুর্বিক্ষের মোকাবিলায় খুব ব্যস্ত; আগামী দিনের কাজের জন্য কয়েকটি ছেলেকে শিক্ষাদান ছাড়া ট্রেনিং-এর কাজে আর বেশি পরিশ্রম দিতে পারছি না। “খাওয়ানোর কাজটাতেই” আমার সব শক্তি এবং সম্বল শুষে নিচ্ছে।” 

(মিসেস ওলি বুলকে লেখা)- 
“জো একজন মহিলা চিকিৎসক খুঁজে বার করেছে, তিনি সম্মোহনী চিকিৎসা করে থাকেন। আমরা দুজনেই তাঁর চিকিৎসাধীন। জো-র ধারণা-তিনি আমাকে বেশ চাঙ্গা করে তুলেছেন। আর বলছে, তার নিজের ওপর অলৌ্কিক ফল ফলছে। সম্মোহনী চিকিৎসার ফলে হোক, ক্যালিফোর্নীয়ার ওজনের গুণে হোক, কিংবা বর্তমান কর্মের দশা কেটে যাবার দরুনই হোক, আমি সেরে উঠছি। রাতে পেটভরা খাবার পরেও তিন মাইল হাঁটতে পারা একটা মস্ত ব্যাপার।”

- তিনি বোঝাতে চেয়েছেন শুধু কাজ করলেই হবে না, শরীরে রক্ত চলাচল সুষ্ঠুভাবে হতে হবে। - 

“আমাদের অন্যান্য জাতের কাছে অনেক শেখবার আছে। বলি- খাওয়া তো সব দেশেই এক; তবে আমরা পা গুটিয়ে বসে খাই, বিলাতিরা পা ঝুলিয়ে বসে খায়। এখন মনে কর যে, আমি এদের রকমের রান্না খাওয়া খাচ্ছি, তা বলে কি এদের মতো ঠ্যাং ঝুলিয়ে থাকতে হবে? আমার ঠ্যাং যে যমের বাড়ী যাবার দাখিলে পড়ে-টনটনানিতে যে প্রাণ যায়, তার কি? কাজেই পা গুটিয়ে, এদের খাওয়া খাব বইকি। ঐ রকম বিদেশী যা কিছু শিখতে হবে, সেটা আমাদের মতো করে -পা গুটিয়ে আসল জাতীয় চরিত্রটি বজায় রেখে। বলি কাপড়ে কি মানুষ হয়, না মানুষে কাপড় পরে? শক্তিমান পুরুষ যে পোশাকই পরুক না কেন, লোকে মানে; আর আমার মতো আহাম্মক ধোপার বস্তা ঘাড়ে করে বেড়ালেও লোকে গ্রাহ্য করে না। 

তবে দু-দেশ তুলনা করা সোজা হবে, এই ভণিতার পর। এরাও ভাল, আমরাও ভাল। ‘কাকো নিন্দো, কাকো বন্দো, দুয়ো পাল্লা ভারি।' তবে ভালোর রকমারি আছে, এইমাত্র।” 

“প্রিন্স ইন্ডিয়ান” কি ভাবে সরলরেখায় দু-দেশ কে এক জায়গায় এনেছেন তা আমাদের চোখে সত্যি ই অভাবনীয়। আবার রাঁধুনী-কেও কিন্তু বাদ দেন নি। এমনই মজাদার ছিলেন তিনি। আমরা অন্য দেশের খারাপগুলো আগে অনুকরণ করার চেষ্টা করি, কিন্তু নিজেদের দেশের ভালোগুলো বয়কট করি। কারণ , আমরা ভীষণ অনুকরণপ্রিয়। 

“বারে ফিরে ফিরে তোমার পানে দিবারাতি ঢেউয়ের মতো চিত্ত বাহু হানে...।” 

-তিনি আবার বলেছেন, 
“আমাদের রান্নার মতো পরিষ্কার কোথাও নেই। বিলেতি খাওয়ার শৃঙখ্লার মতো পরিষ্কার পদ্ধতি আমাদের নেই। আমাদের রাঁধুনি স্নান করেছে, কাপড় বদলেছে; হাঁড়িপত্র, উনুন-সব ধুয়ে মেজে সাফ করেছে; নাকে মুখে গায়ে হাত ঠেকলে তখনি হাত ধুয়ে তবে আবার খাদ্যদ্রব্যে হাত দিচ্ছে। বিলাতি রাঁধুনির চৌদ্দপুরুষে কেউ স্নান করেনি; রাঁধতে রাঁধতে চাখছে, আবার সেই চামচ হাঁড়িতে ডোবাচ্ছে। 

-রুমাল বার করে ফোঁৎ করে নাক ঝাড়লে, আর সেই হাতে ময়দা মাখলে। শৌচ থেকে এল-কাগজ ব্যবহার করে, সে হাত ধোবার নামটিও নেই-সেই হাতে রাঁধতে লাগলো। কিন্তু ধপধপে কাপড় আর টুপি পরেছে। হয়ত একটা মস্ত কাঠের টবের মধ্যে দুটো মানুষ উলঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়ে রাশীকৃত ময়দার উপর নাচছে-কি না ময়দা মাখা হচ্ছে। গরমি কাল-দরবিগলিত ঘাম পা বেয়ে সেই ময়দায় সেঁধুচ্ছে। তার পর তার রুটি তৈয়ার যখন হল, তখন দুগ্ধফেননিভ তোয়ালের উপর চীনের বাসনে সজ্জিত হয়ে পরিষ্কার চাদর বিছানো টেবিলের উপর, পরিষ্কার কাপড় পরা কনুই পর্যন্ত সাদা দস্তানা পরা চাকর এনে সামনে ধরলে! 

কোনও জিনিস হাত দিয়ে পাছে ছুঁতে হয়, তাই কনুই পর্যন্ত দস্তানা। 

আমাদের স্নান করা বামুন, পরিষ্কার হাঁড়িতে, শুদ্ধ হয়ে রেঁধে গোময়সিক্ত মাটির উপর থালশুদ্ধ অন্নব্যঞ্জন ঝাড়লে; বামুনের কাপড়ে খামছে ময়লা উঠছে। হয়তো মাটি ময়লা গোবর আর ঝোল কলাপাতা ছেঁড়ার দরুণ একাকার হয়ে এক অপূর্ব আস্বাদ উপস্থিত করলে !! চাই কি? --- পরিষ্কার শরীরে পরিষ্কার কাপড় পরা। মুখ ধোয়া দাঁতমাজা-সব চাই, কিন্তু গোপনে। পরিষ্কার রাঁধুনি, পরিষ্কার হাতের রান্না চাই। আবার পরিষ্কার মনোরম স্থানে পরিষ্কার পাত্রে খাওয়া চাই--'আচারঃ প্রথমো ধর্মঃ' । এত ওলাউঠা, এত মহামারী, ম্যালেরিয়া-কার দোষ? আমাদের দোষ। আমরা মহা অনাচারী!!!!” 


৪ 

স্বামীজী আমিষ খাওয়া বেশি পছন্দ করতেন- নানা উদাহরণ সহ আমরা জানতে পারি । তিনি একজন খ্যাতনামা রাঁধুনী ও ছিলেন। নানা অকেশনে তিনি মাটন পুলাও রান্না করতেন তাঁর শিষ্যদের বাড়িতে। বেলুড় মঠে একদিন এক ভক্ত আসেন মাংস নিয়ে নিজের গুরুদেবের জন্য। সব চেয়ে বেশী মজার কথা হলো তিনি যেমন খেতে ভালোবাসতেন তেমনি রান্না করতেও ভালবাসতেন। এবং তাঁর প্যাশন ছিল নানা রকম চা এর। তিনি ভেজিটেরিয়ান ছিলেন না মোটেই, শুধু মাছ না- মাংস-এ মধ্যে গরুর মাংস ও বাদ দিতেন না। 

তিনি নিউ ইয়র্ক থেকে কোলকাতায় গুরুভাইদের লিখেছিলেন যে, 

“এখন তোমরা অনেক ইলিশ খাচ্ছো তোমাদের ইচ্ছামত-এখানে অনেকরকমের শাক যেগুলো খেতে nate এর মত আর তারা বলে -'এ্যস্প্যারাগাস' অনেকটা ঠিক ছোট কচি dengo-এর মত খেতে”। 

তাঁর কথায়ঃ 

“খাদ্য শুধু পেট ভরানোর জন্যই নয় শারীরিক শক্তি যোগানোর পাশাপাশি আধ্যাত্মিক শক্তির সম্পূরকই হলো সু-খাদ্য”।

তিনি গরম খাবার পছন্দ করতেন, তা বেলুড় মঠে গেলে এখনও বোঝা যায় যে, ইন্সটিটিউশন-এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আমাদের প্রবাদপুরুষ স্বামীজী। 

খেতে খুব ভালবাসতেন, কিন্তু জীবনের শেষ দিকে ২১ দিন ভালো খাওয়া তো দূরের কথা, জল পর্যন্ত না খেয়ে কাটাতে হয়েছে, কবিরাজের অনুরোধে। 

নরেন তাদের পাড়ায় স্থাপন করেছিলেন greedy club, যাদের মূল motto ছিল ভোজন ও নানা দেশের রান্না নিয়ে রিসার্চ, ফ্রেঞ্চ রান্না করেছিলেন নরেন থাকাকালিন-হাঁসের ডিম ফেটিয়ে চালে মাখিয়ে করাইশুঁটি আর আলু দিয়ে ভুনি খিচুড়ি মত। ভালবাসতেন জীবে গজা, কারণ তার একটা ঘটনা আছে, একবার এক যায়গায় জীবে গজা এসেছে, তিনি একটা তুলে নিয়ে জিভে ঠেকিয়ে গোটা হাঁড়িটায় সেই এঁটো গজা টা ফেলে দিলেন, তাতে করে সবটা এঁটো হল, কেউ খেতে পারলো না, তিনি একাই খেয়ে ফেললেন, এটা নরেন থাকাকালিন। এ-থেকেই বুঝতে পারা যায় তিনি কতখানি চঞ্চল ছিলেন কিশোর বয়সে। 

নরেন একদিন পুলিন মিত্র নামে সেই সময়ের তৎকালীন গায়কের বাড়ি গেছেন, কচুরী ভেজে দেওয়া হয়েছে তাঁকে, খুব খুশী, হয়ে বলছেন, “বেশ চমৎকার”। যদিও বিবেকানন্দ রূপে লেখাতে কচুরীর তীব্র সমালোচনা করেছেন, বলেছেন কচুরী জিলিপি খানায় ফেলে দিতে। 

আবার সেই ঠাকুরের অসুখের সময় হোটেলে গিয়ে মহানন্দে মুরগীর ফাউল কারী খেয়ে এসেছিলেন। কিন্তু এই সময়েই তীব্র অভাব বাড়িতে, টানা উপবাসে কাটাতে হয়েছে। 

বরানগরে থাকার সময় কিছুই জুটতো না, ভিক্ষার চাল সিদ্ধ করে তা কাপড়ের ওপর ঢেলে সকলে মিলে খেতেন এবং সঙ্গে ছিল নুন আর লংকার একটা ঝোল। তাতে সকলে মিলে হাত ডোবাতেন, অনেকটা টাকনার মত, আর ভাত খেতেন।- আসলে তিনি দেখিয়ে গেছেন আমাদের যে, যে কোন খাদ্য-ই হোক না কেন- তৃপ্তি সহকারে তা গ্রহণযোগ্য। 

এরপর দেশভ্রমণ কালে আবার অনাহার, এক সময় প্রায় মৃত্যুমুখে, শেষে এক ফকিরের দেয়া শসা খেয়ে প্রাণরক্ষা। বিদেশে পৌঁছে সব টাকা শেষ, আলসিঙ্গাকে টেলিগ্রাম করলেন টাকা পাঠাও। তবে এরপর বিদেশে কিছুদিন-এর পরে খাবার সমস্যা আর হয় নি, জানতেন খাবার আদব কায়দা, সারদানন্দকে শিখিয়েছিলেন কি ভাবে knife ডান হাতে ধরতে হয়, কিভাবে স্যুপ খেতে হ্য়, কিভাবে চামচ ধরতে হয়। সত্যি কি অসাধারন জীবনীশক্তি না থাকলে সব কিছু একধারে সুষ্ঠুভাবে পালন করা যে কোনো মানুষের পক্ষে অসম্ভব। একদিন ভাই মহেন্দ্রনাথ এক বিদেশীনির বাড়ি খেয়ে এলেন, চাপাটি রুটি মাংসের একটা তরকারী,আরো দুটো তরকারী। শুনে স্বামীজীও ওই রকম খাবার সেই বিদেশীনির বাড়ি গিয়ে খেতে ইচ্ছাপ্রকাশ করলেন, যদিও তা আর হয়ে ওঠে নি। তাঁর অত্যধিক বালকসুলভ ব্যবহার এর থেকে আমরা পাই। 


৫ 

ঝাল খেতে খুব ভালবাসতেন, পরিব্রাজকরূপে একবার রাখাল মহারাজ খিচুড়ি রান্নার সময় এক ডেলা মিছরী দিয়ে দেন, তাতে তিনি খুব রেগে যান, তাতে মনে হয় মিষ্টি পছন্দ নয়, যদিও লুচি পায়েস পছন্দের খাবার, তা খেয়ে যেতেন সুগার হবার পরেও। কাঁচালংকার প্রতি খুব টান, বিদেশে গিয়ে খুঁজেছেন। কিনে নিয়ে ব্রেকফাস্ট খেয়ে যাচ্ছেন একের পর এক, একবার কোন শিষ্যের সাথে বাজী ধরে ৫০টা শুকনো লঙ্গা খেয়ে ফেলেছিলেন। 

তাঁর রান্নায় থাকত প্রচুর মশলার সমাগম, লোকে খেয়ে বলত, elaborate and alarming for health! 

শ্যামবাজারের ঢাকাই পরোটা, ছোলার ডাল আর জিলিপি খুব ভালবাসতেন। আবার ভালোবাসতেন ঝিনুক রান্না করে বেশ ঝাল করে খেতে। 

আরেকটা সূত্র জানাচ্ছে, একই বাড়িতে থাকতো, সুপ, মাছ বা মাংস, সবজি এবং আমেরিকান পাই। তবে ডিনারে ও দেশে কফির চল থাকলেও তিনি খেতেন না। বরং চাপাটি আর কারি চেয়ে নিতেন। 

ফল হিসাবে পছন্দ আঙ্গুর, লিচু, আম। আম ভালবাসতেন বরফ দিয়ে ভিজিয়ে , লিচু ভক্তদের কাছে দীক্ষাদানের সময় চেয়ে নিতেন গুরু দক্ষিণা হিসাবে। সম্ভবত ভালোবাসতেন বলেই। আর আঙ্গুর সম্বন্ধে বলেছেন খেলে রক্ত পরিষ্কার হয়, খাওয়া খুব ভাল। ভাই মহেন্দ্রনাথ লিখেছেন- একাবার ম্যাকলাউডের বাড়িতে আনারস কেটে গুঁড়ো চিনি দিয়ে খাবার কথা ও অন্যান্যদের দেবার কথা। 

পেঁয়াজ সম্বন্ধে বলেছেন আধ্যাত্ম পথের লোকের জন্য পেঁয়াজ সেরা খাদ্য নয়। যদিও নিজে ছেলে বেলায় খেতেন খুব, এবং বলেছেন, 

“ছোটো বেলায় আমি কি ভীষণ ভালোবাসতাম, পিঁয়াজ খেয়ে মুখের গন্ধ দূর করবার জন্যে খোলা হাওয়ায় অনেকক্ষণ হাঁটা চলা করতাম।” 

ডাল ভালবাসতেন, বিশেষ করে কড়াইয়ের ডাল, অনেকের কাছে খেতে চেয়েছেন। আর ভীষণ প্রিয় আইস্ক্রিম, ডিনার টেবিল ছেড়ে চলে যেতে চাইলেই মিসেস লেগেট ঘোষণা করতেন আইস্ক্রিম-এর কথা। অমনি বাচ্ছাদের মতো বসে থাকতেন। বিশেষ করে আইসক্রীমের ক্রীমটা খুব পছন্দ করতেন। খেয়ে বলেছেনঃ “food for Gods! Really divine.” 

আরেকবারের বর্ণনা, ২য় বার বিদেশে গিয়ে california তে থাকার সময় প্যাসাদোনায় স্বামীজীর ব্রেকফাস্টের পছন্দ ফল, ডবল ডিমের পোচ, দুটি টোস্ট, চিনি ও ক্রিম সহ কফি। আর দুপুরে মাটন আর নানারকমের শাকসব্জি ওনার জন্য রাখা হতো। ডেসার্ট হিসাবে ফল বিশেষত আঙ্গুর। একবার বিদেশ (ভারতবর্ষের বাইরে) সফর শেষে, স্বামীজী কোলকাতায় ফিরলেন মাদ্রাজ হয়ে। ট্রেণ শিয়ালদহ পৌঁছালো তখন প্রায় সকাল ৯টা । বহু কষ্টে ঘোড়ার গাড়ীতে করে বেলুড় পৌঁছালেন তখন প্রায় রাত সাড়ে দশটা বাজে। পৌঁছে দেখলেন মঠের গেট বন্ধ হয়ে গেছে। তখন কোনো চেঁচামিচি ডাকাডাকি তে গেট খুললো না, এদিকে খিদেয় প্রাণ যায় যায়। ভিতর থেকে কিছু খাবার এর গন্ধ ও আসছে। তাই আর দেরি না করে পাঁচিল টপকালেন। 

পৌঁছে গেলেন সোজা খাবার ঘরে। সবাই তো দেখে অবাক-

“তুমি কি করে ভিতরে এলে? আমরা তো জানি না তুমি আসছো” 

স্বামীজী বললেনঃ 

“শালা! তোমরা বসে খিচুড়ি আর পাঁপড় খাবে, আর আমি শালা বাইরে খালি পেটে ভজন কোরবো? তাতো চলবে না।” 

স্বামীজীর খিচুরী অত্যন্ত প্রিয় খাবার ছিল। তিনি নিজে খুব ভাল খিচুড়ী রান্না করতেন, নানা রকম মশলা , ডাল চাল দিয়ে খিচুড়ি নিজে হাতে রান্না করতে। পরিবেশন করতে ভালবাসতেন। বহুবার সিস্টার নিবেদিতাকেও উনি নিজ হাতে খিচুড়ী রান্না করে পরিবেশন করে সম্পূর্ণ মঠ সহ সবাইকে খাইয়েছেন। এমনি ছিলেন খাদ্যরসিক। 

তিনি সব দেশ ঘুরে বলেছিলেনঃ 

“হিঁদুরাই ঠিক অর্থাৎ হিঁদুদের ঐ যে ব্যবস্থা যে জন্ম -কর্ম-ভেদে আহারাদি অবশ্যি পৃ্থক, এইটিই সিদ্ধান্ত। নানান দেশ দেখেছি, নানান রকমের খাওয়াও দেখেছি। তবে আমাদের ভাত-ডাল-ঝোল-চচ্চড়ি-সুক্তো-মোচার ঘন্টের জন্য পুনর্জন্ম নেওয়াও বড় বেশী কথা মনে হয় না। দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝছ না, এইটাই আপসোস।”

“কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো...” 

এক আউন্স পরিমাণ আনন্দ আর এক পাউন্ড পরিমাণ যন্ত্রণার কারণ। একটি শক্তি এক এক সময় আনন্দরূপে, আবার অন্য সময় বেদনার আকারে প্রতীয়মাণ হয়। যে মুহূর্ত্তে একদল চেতনা স্তব্ধ হয়। আর এক দলের কাজ আরম্ভ হয়ে যায়। 



তথ্য সংগ্রহঃ
বিবেকানন্দের রচনা সংগ্রহ, শ্রী শ্রী লাটু মহারাজের স্মৃতিকথা, Western Women in the footsteps of Swami Vivekananda, and Internet Wikipedia.

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়











প্রচ্ছদ নিবন্ধঃ 

রবীন্দ্রনাট্য এখনো বাঙালির অন্তরের আত্মীয় হয়ে উঠল না
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



রবীন্দ্রনাথের গানের গায়কদের প্রতি তাঁর পরামর্শ ছিল ‘দেখো আমার গান যেন আমারই গান মনে হয়’। এক গভীর বিশ্বাসে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন “বাঙালিকে সুখে দুঃখে আমার গান গাইতেই হবে” । নিজের সংগীত ভাবনা নিয়ে সমকালীন সঙ্গীতবেত্তাদের সঙ্গে দীর্ঘ তর্ক করেছেন, বাংলা গানের পূর্বাপর সম্পর্কে অজস্র দলিল রেখে গেছেন রবীন্দ্রনাথ । সঙ্গীতে, সাহিত্যে বাঙালির মননের সবটাই জুড়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু নাটকের রবীন্দ্রনাথ কিছুটা ব্রাত্যই থেকে গেছেন । বাংলা সাধারণ রঙ্গালয়ের দেড়শ’বছরের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথের নাটক বাঙালি গ্রহণ করেনি । এমনকি ১৯৬১তে তাঁর জন্ম শতবার্ষিকীতে যখন ব্যাপক রবীন্দ্র অধ্যয়ন ও চর্চা, তাঁর গানের দিগন্তবিস্তারী প্রসার তখনও আমাদের রঙ্গমঞ্চ রবীন্দ্র নাটক থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল ।

অথচ রবীন্দ্রনাথ পঞ্চাশটির মত নাটক লিখেছিলেন । নাটকের সব কটি রূপই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন । মঞ্চ নাট্য, কাব্য নাট্য, গীতি নাট্য ও নৃত্য নাট্য সবই আছে তাঁর সৃষ্টি ভুবনে । রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য ছোট বড় নানান সংস্থা, পাড়ায় পাড়ায় নানান ক্লাব, নাচ গানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্কুলে সারা বছর ধরেই হয় কিন্তু তাঁর মঞ্চ নাটককে বাঙালি গ্রহণ করেছে প্রাণের সঙ্গে, এমন বলা যাচ্ছে না । রবীন্দ্রনাথের প্রথম নাটক ‘রুদ্র চন্ড’ প্রকাশিত হয় ১৮৮১তে আর শেষ নাটক ‘চন্ডালিকা’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৩এ । ‘চন্ডালিকা’ মঞ্চ নাটক রূপেই রচিত হয়েছিল পরে সেটি নৃত্য নাট্যে রূপান্তরিত করেন । তাঁর শেষ গীতিনাট্য ‘শ্যামা’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৮এ । তাহলে দেখা যাচ্ছে যে তাঁর সমুদ্রপ্রমাণ সৃষ্টি অন্যান্য ক্ষেত্রের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ নাট্যক্ষেত্রেও বিচরণ করেছিলেল প্রায় ৬১ বছর । আর শুধুমাত্র নাট্য রচনাই তো নয়, নাটকের প্রযোজনা, পরিচালনা, দৃশ্যপট ও সঙ্গীত নির্মাণ এবং অভিনয় সবকিছুই করেছিলেন । এইসব ক্ষেত্রেই তাঁর নিজস্ব ভাবনা ছিল । একটা নিবন্ধের পরিসর এই সমস্ত বিষয়গুলিকে ছুয়ে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ঠ নয় । আমি বুঝতে চাইছি তাঁর নাট্যভাবনা নাটক প্রিয় বাঙ্গালির কাছে অনাদৃত থেকে গেল কেন, এবং অবশ্যই বুঝতে চাইব আজকের প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাট্যের প্রাসঙ্গিকতা । 

নাটক লেখা হয় মঞ্চে অভিনয়ের জন্য আমাদের কাছে নাটক কখনোই পাঠ্যবস্তু হয়ে ওঠেনি । তাই কালিদাস, সেক্সপীয়ার, মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ, চেকভ, ইবসেনের মত কিছু ব্যতিক্রম ভিন্ন নাটক আমাদের কাছে এখনো সাহিত্য পদবাচ্য নয় । আমরা জানি, এদেশে নাট্যধারার উদ্ভব ও বিকাশ স্বাভাবিক পথে হয়নি, হয়েছে উপনিবেশবাদের প্রভাবে, দ্রুত নগরায়ন ও শ্রেণী বিন্যাস ও ইউরোপীয় ভাবনার অভিঘাতে । ১৭৯৫এ এখনকার এজরা স্ট্রীটের কাছে ডুমতলায় অস্থায়ী মঞ্চ বেঁধে গেরেসিম লেবেডেফ নামক একজন রুশ পর্যটক একটি অনুবাদ প্রহসন মঞ্চস্থ করেছিলেন, সেটিকেই প্রথম বাংলা নাট্যাভিনয় বলে ধরা হয় । যদিও এর দ্বারা বাংলা নাট্যাভিনয়ের কোন ধারাবাহিকতার সৃষ্টি হয়না, কেননা এরপর প্রায় ষাট বছর অভিনয় যোগ্য কোন বাংলা নাটকই লেখা হয়নি । ১৮৫৮তে রচিত রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘কুলিন কুল সর্বস্বই’ প্রথম মৌলিক বাংলা নাটক । ইতিমধ্যে ইংরাজ কর্মচারীদের বিনোদনের জন্য কলকাতায় লন্ডনের মত লুই থিয়েটার হয়েছে, জমিদার বাবুদের অঙ্গনে মাঝে মধ্যে নাট্যাভিনয় হচ্ছে । সেসব নাট্যাভিনয়ে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকতো না এবং নাটকগুলিও হত স্থুল বিনোদনমূলক । ১৮৫৯-এ মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা নাট্যক্ষেত্রে প্রবেশ করলেন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক লিখে । ‘শর্মিষ্ঠা’র ভুমিকায় মাইকেল লিখেছিলেন “অলীক কূনাট্য রঙ্গে মজে লোকে রাঢ়েবঙ্গে / নিরখিয়া প্রাণে নাহি সয়”।

১৮৭২-এর ৬ই ডিসেম্বর যখন দীনবন্ধু মিত্রর ‘নীলদর্পন’ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে সর্বসাধারণের জন্য সাধারণ রঙ্গালয়ের সূচনা হল, রবীন্দ্রনাথ তখন এগারো বছরের শিশু । অচিরেই বাংলা থিয়েটারে প্রতাপ জহুরী, গুর্মুখ রায়, গোপাল শীল প্রমুখ ব্যবসায়ীদের প্রবেশ এবং ব্যবসায়ী কবলিত পেশাদারী থিয়েটারের শুরু । বাংলা থিয়েটারে তখন গিরিশ চন্দ্র ঘোষ, ক্ষীরোদ প্রসাদ বিদ্যা বিনোদ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অমৃতলাল বসু প্রমুখ নাট্যরথীদের পৌরাণিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটকের বর্ণাঢ্যতা । ১৮৮৬তে রবীন্দ্রনাথের ‘বৌঠাকুরানীর হাট’ উপন্যাসের কেদার চৌধুরী কৃত নাট্য রূপান্তর ‘রাজা বসন্ত রায়’ নামে মঞ্চস্থ হয় । নাটকটি মঞ্চ সাফল্য পায় নি । তাঁর জীবনকালেই বাংলা রঙ্গালয় নাট্যচর্চার উদ্ভব ও বিকাশ কিন্তু সেই নাট্যধারা রবীন্দ্রনাথকে আগ্রহী করে তোলেনি মোটেই । বিশ্বের সব শ্রেষ্ঠ নাট্যকারেরাই তাঁদের দেশের বণিজ্যিক থিয়েটারের আওতাতেই নাটক লিখেছেন, বাণিজ্যিক থিয়েটারের প্রথা প্রকরণকে মেনে নিয়েই । কিন্তু আমাদের বাণিজ্যিক থিয়েটারের তেমন কোন প্রযোজকই ছিলেন না যিনি রবীন্দ্রনাথকে বাণিজ্যিক থিয়েটারের গন্ডিতে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারতেন । শিশির কুমার ভাদুড়ি বেশ কয়েকটি রবীন্দ্র-নাটকের প্রযোজনা করেছিলেন বটে, কিন্তু মঞ্চসফল করে তুলতে পারেননি ।

ব্যবসায়িক রঙ্গালয় অর্থাৎ আমাদের পরিচিত নাট্যবৃত্তে রবীন্দ্রনাট্য মঞ্চসাফল্য পায়নি, এমন কথায় বোধকরি বিতর্কডিজে জায়গা নেই । কেন পায়নি সেটা একটা বিস্ময় নিশ্চিত ভাবেই । নিজের সংগীত সৃজনের প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ যেমন ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে বাঙ্গালী সুখে-দুঃখে চিরকাল তাঁর গানই গাইবে , নাটকের ক্ষেত্রে তেমন বলে যেতে পারেন নি । তার কারণ বোধ করি এই যে, তাঁর ৬১ বছরের নাট্যজীবনকালে গিরিশচন্দ্র ঘোষ থেকে শিশির কুমার ভাদুড়ী পর্যন্ত বাংলার নাট্যশিল্পের যে পরিক্রমা তা রবীন্দ্রনাথকে কিছুমাত্র প্রভাবিত করতে পারেনি, তিনিও সাধারণ রঙ্গালয় সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলেন । থিয়েটার সম্পর্কে তাঁর একমাত্র প্রবন্ধ ‘রঙ্গমঞ্চ’এ রবীন্দ্রনাথ লিখে গিয়েছেন ‘বিলাতের নকলে আমরা যে থিয়েটার করিয়াছি, তাহা ভারাক্রান্ত একটা স্ফীত পদার্থ । তাহাকে আপামর সকলের দ্বারের কাছে আনিয়া দেওয়া দুঃসাধ্য । তাহাতে লক্ষীর পেঁচাই সরস্বতীর পদ্মকে আচ্ছন্ন করিয়া আছে” । এই আগ্রহ হারানোর ফলেই ১৮৯৬ থেকে ১৯০৮ এই বারো বছর রবীন্দ্রনাথ কোন নাটক রচনা করেন নি, অন্য সব ক্ষেত্রে তাঁর অফুরন্ত সৃষ্টির ধারা অব্যাহত থাকলেও । জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে বড়দা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নাটক লিখতেন, পারিবারিক উৎসব আয়োজনে সেই নাটক অভিনয় হত । সেই সময়কার সাধারণ রঙ্গালয়ে গ্রেট ন্যাশানাল থিয়েটার বা ন্যাশানাল থিয়েটারে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ছিলেন প্রমুখ নাট্যকার । রবীন্দ্রনাথ তখন তাঁর কৈশোর পেরননি । জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়ির পারিবারিক অনুষ্ঠানের নাট্যআবহ থেকেই তাঁর নাটক লেখার প্রাথমিক প্রেরণা ।

ইউরোপীয় অভিঘাতে উদ্ভুত আমাদের পরিচিত প্রসেনিয়াম থিয়েটারের নাট্যপ্রয়োগ রীতি রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেনি । নাট্যউপস্থাপনা, দৃশ্য ও মঞ্চবিন্যাস ও প্রকাশ ভঙ্গি্র প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ এক ভিন্নতর রীতি প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন । প্রখ্যাত পাঞ্জাবী নাট্যকার বলবন্ত গার্গী বলেছেন ‘রবীন্দ্রনাথের নাটক আদ্যপ্রান্ত ভারতীয় নাট্যশৈলীর অনুসারী’ । ‘ভারতীয় নাট্যশৈলী’ কথাটার মধ্যে একটা ধাঁধাঁ আছে । কারণ আমাদের নাট্যধারার উদ্ভব ও বিকাশ সনাতন ভারতীয় নাট্যশৈলী বা সংস্কৃত নাট্যশৈলীর অনুসারী ছিল না । প্রাচীন সংস্কৃত নাট্যধারার স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে ইউরোপীয় নাট্যধারা আসার অনেক আগেই । সুতরাং ভারতীয় নাট্যশৈলী বলতে আমরা বুঝবো নাটকের পম্পরাগত শৈলী এবং নাট্য প্রয়োগের নানান পরীক্ষা নীরিক্ষা ও নব নব প্রয়োগের দ্বারা পরিবর্তীত নাট্যশৈলী - এই দুই দিগন্তের মিলন । উপনিবেশবাদ, দ্রুত নগরায়ন ও নূতন শ্রেণী বিন্যাস বাংলার নিজস্ব নাট্যধারার বিকাশ হতে দেয়নি, যদিও আমাদের নানান লোককথা, কৃষ্ণ যাত্রা, পাঁচালি গান ও মঙ্গল কাব্যে এমনকি কীর্তন গানেও নাট্যের উপাদান ছিল । রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাট্য উপস্থাপন রীতিতে লোক আঙ্গিক গ্রহণ করেছিলেন । প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ‘রিয়ালিস্টিক’ মঞ্চ ব্যবহার তাঁর পছন্দ ছিল না, বরং দৃশ্যপটহীন যাত্রা তাঁকে আকর্ষণ করত কারণ তাতে দর্শকমন্ডলীর সঙ্গে নাট্যকথার নৈকট্য থাকে । তপতী নাটকের ভূমিকায় একথা তিনি লিখেছেন । এবং বোধ করি এই কারণেই আমাদের রঙ্গালয় রবীন্দ্র নাট্যকে গ্রহণ করেনি । তাঁর ৬১ বছরের নাট্যজীবন কালের মাত্র সাতাশটি নাটক বা নাট্যরূপের অভিনয় হয়েছে , তাঁর ৪১ট মঞ্চ নাটকের মধ্যে বেশীর ভগাগই অভীত হয়নি পূর্ণাঙ্গ নাটক বলতে অভিনীত হয়েছে ‘রাজাও রাণী’ ‘বিসর্জন’, ‘শেষ রক্ষা’, ‘তপতী’, ‘চিরকুমার সভা’, এবং ‘গৃহ প্রবেশ’। তাঁর জীবদ্দশার ‘রক্তকরবী’র মত নাটক অভিনীতই হয়নি । বস্তুত তাঁর মৃত্যুর পরেও ১৩বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে আমাদের সার্থক রবীন্দ্রনাট্য প্রযোজনার সাক্ষী থাকার জন্য । ১৯৫৪তে শম্ভূ মিত্র ‘বহুরূপী’ প্রতিষ্ঠার পর ‘রক্ত করবী’ মঞ্চস্থ করলেন । তারপর একের পর এক ‘চার অধ্যায়’, ‘মুক্তধারা’, ‘বিসর্জন’, ‘রাজা’, ‘অচলায়তন’, ‘ডাকঘর’, ‘তপতী’, ‘কালের যাত্রা’, ‘দশ চক্র’ প্রভৃতি রবীন্দ্র নাট্যের সার্থক মঞ্চায়ন করেছিলেন । 

বলা যায় ১৯৫৪র পর থেকেই আমরা নাটকের রবীন্দ্রনাথকে চিনতে শুরু করলাম । কিন্তু গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে কলকাতা বা মফঃস্বল বাংলায় গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলনের যে প্রবাহ, সেখানে রবীন্দ্রনাট্যের আন্তরিক প্রযোজনা সামান্যই, বহুরূপীর প্রযোজনাগুলি বাদ দিলে । শম্ভুমিত্র ছাড়া সমকালীন বাংলা নাট্যজগতের দুই দিকপাল উৎপল দত্ত ও অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রবীন্দ্র নাটক করেন নি । উৎপল দত্ত তাঁর লিটল থিয়েটার গ্রুপের প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে ‘অচলায়তন’, ‘তপতী’ নাটক করেছিলেন, কিন্তু ‘অংগার’, ‘কল্লোল’, ‘ব্যারিকেড’, ‘টিনের তলোয়ার’-এর উৎপল দত্ত সার্থক রবীন্দ্র নাটক করেননি । এই না করার কারণ নিশ্চিত ভাবেই তাদের অক্ষমতা নয়, দর্শক সমাদৃত না হবার সংশয় । আর এক নাট্যব্যক্তিত্ব বাদল সরকার যিনি চিরাচরিত প্রসেনিয়াম থিয়েটারের বাইরে খোলা আঙ্গিনায় অন্য থিয়েটারের প্রবক্তা এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন “আমাদের ফর্মেও রবীন্দ্রনাথ করা যায়, করিনা রবীন্দ্র ভক্তদের ভয়ে” । অর্থাৎ আমাদের পরম্পরাগত নাট্যবৃত্তে অভ্যস্ত দর্শকমন্ডলীর কাছে রবীন্দ্রনাট্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে তারও সংশয় ছিল । চল্লিশের দশক থেকে রবীন্দ্রনাথের একটি নাটকই গ্রুপ থিয়েটারকে সর্বাধিক আকর্ষণ করেছে, সেটি ‘বিসর্জন’ । কারণ নাটকটির সহজবোধ্যতা ।

স্বীকার করে নিতেই হবে যে আজকের প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথকে আত্মস্থ করে উল্লসিত হয়ে উঠতে পারেনি যারা নাটক করছেন ছোট বড় গ্রুপ থিয়েটারের নাট্য কর্মীরা তারাও তাদের নাটকের এজেন্ডায় রবীন্দ্রনাথকে রাখেন না । কেন রাখেন না ? কারণ, আমরা নাটকের ক্ষেত্রে সমকালীনতা আর দৈনন্দিনতাকে ধরতে চেয়েছি যতটা, বিস্তৃত জীবনের অন্তর্লোককে স্পর্শ করতে ততটাই অনীহা দেখিয়েছি । বিশিষ্ট রবীন্দ্র নাট্যবোদ্ধা কুমার রায়ের একটি মন্তব্য স্মরণ করি “যথেষ্ট ভালোবাসিনি আমরা রবীন্দ্রনাথকে । এই ভালোবাসতে না পারাটাই সবচেয়ে বড় বাধা বলে মনে করি” । 

বিদগ্ধ সাহিত্য আলোচক অশ্রু কুমার শিকদার রবীন্দ্রনাটকের এক অভিন্ন বৈশিষ্টের প্রতি নির্দেশ করেছেন, তা হল ‘জড়শক্তির সঙ্গে প্রাণশক্তির বিরোধ, পরিণামে প্রাণশক্তির জয় লাভ’ । সমকালীন বাস্তবের অনুপুঙ্খ ছায়াপাত তাঁর নাট্য রচনায় নেই, কিন্তু বন্ধন ও মুক্তির যে দ্বন্দ তাঁর নাটকে তা আবহমান কালের, তাৎক্ষণিকতায় আবদ্ধ নয় । ‘রক্তকরবী’ ধনবাদী সভ্যতা আর সংকট থেকে মুক্তির রূপক । ‘মুক্তধারা’ নাটকে রাজার বিরুদ্ধে কৃষিজীবি প্রজাদের বিদ্রোহ , ‘বিসর্জন’-এ ছদ্ম অহংকার সংস্কারাচ্ছন্ন দম্ভ আর প্রতিপত্তির বিপ্রতীপে মানবিকতার জয়বার্তা, ‘রথের রশি’-তে সম্মিলিত শুদ্রশক্তির জয়গান ‘অচলায়তন’-এ জীর্ণ সংস্কার আর নিষেধের প্রাচীর ভাঙ্গার আহবান, কালের চালিকাশক্তি রূপে সম্মিলিত শুদ্রশক্তির অভিষেকের অনিবার্যতা দেখেছিলেন তিনি । – এ সবই তো সমকালেও প্রাসঙ্গিক ।

‘রক্তকরবী’ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ‘যাত্রী’ গ্রন্থে লিখেছেন “যক্ষপুরে পুরুষের প্রবল শক্তি মাটির তলা থেকে সোনার সম্পদ ছিন্ন করে করে আনছে । নিষ্ঠুর সংগ্রহের লুব্ধ চেষ্টার তাড়নায় প্রাণের মাধুর্য সেখান থেকে নির্বাসিত । সেখানে জটিলতার জালে আপনাকে আপনি জড়িত করে মানুষ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন । তাই সে ভুলেছে, সোনার চেয়ে আনন্দের দাম বেশি ; ভুলেছে, প্রতাপের মধ্যে পূর্ণতা নেই, প্রেমেই পূর্ণতা । সেখানে মানুষকে দাস করে রাখবার প্রকান্ড আয়োজনে মানুষ নিজেকেই নিজে বন্দী করেছে” । ধনবাদী দুনিয়ার স্বরূপ কিংবা আজকের বিশ্বায়ন জাত ভোগবাদের সর্বনাশা রূপের এমন সংকেত কি প্রবল ভাবে প্রাসঙ্গিক ! রবীন্দ্রনাথের নাটকে প্রাণশক্তির বিপুল জয়গান । আমাদের পরিচিত নাট্যবৃত্ত আমাদের দৈনন্দিন সুখ-দুঃখ, পাওয়া-না পাওয়া, সংগ্রাম ইত্যাদি তাৎক্ষণিক আবেগের মঞ্চভাষ্য নির্মাণ করে, কিন্তু রবীন্দ্রনাট্য এই তাৎক্ষণিকতার ঊর্ধে মানবিকতা, পীড়িতের বিজয়, আবহমানতার আলোকে উদ্ভাষিত করে । সাম্রাজ্যবাদ ও ধনতন্ত্রের এবং যন্ত্রের একাধিপত্য যেমন রক্তকরবী ও মুক্তধারা নাটকের ভাববীজ, তেমনই নারী-পুরুষের সমানাধিকার, বর্ণপ্রথা, পীড়িত মানুষের অধিকার অস্পৃশ্যতার সমস্যা নানান রবীন্দ্রনাটকে উচ্চারিত হয়েছে । তাঁর সার্ধশত বর্ষে রবীন্দ্রচর্চার আরো ব্যাপ্তি ঘটেছে । নাটকের ক্ষেত্রেও সীমিত সাধ্যের গ্রুপ থিয়েটারগুলিও রবীন্দ্র নাট্যের প্রযোজনার এগিয়ে আসছেন । রবীন্দ্রনাথের গানকে অন্তরে গ্রহণ করতে বাঙালির অনেক সময় লেগেছে তাঁর প্রয়াণের পরেও । হয়তো নাটকের ক্ষেত্রে আরো সময় লাগবে । আমাদের আশাবাদী থাকতেই হবে যে রবীন্দ্র নাট্যচর্চা প্রসারিত হবে । আমাদের চারপাশের ক্ষুদ্রতার গন্ডি অতিক্রম করে বৃহত্তর চেতনার আলোয় উত্তরণ ঘটাতে পারে রবীন্দ্রনাট্যের সঙ্গে আমাদের আত্মীয়তা স্থাপন ।

প্রচ্ছদ নিবন্ধঃ শ্রীশুভ্র













প্রচ্ছদ নিবন্ধঃ


আমাদের রবীন্দ্রনাথ
শ্রীশুভ্র



আমরা যারা দুতিন পাতা লেখাপড়া শিখে বেশ চৌকশ হয়ে উঠেছি, তারা না পারলাম বিশ্বকবিকে অতিক্রম করে যেতে, না পারলাম তাকে অন্তর থেকে বরণ করে নিতে; কিন্তু কি আশ্চর্য্য তাকে ব্যবহার করে অনেকেই পেশাগত সিঁড়িগুলি পরপর দ্রুত পেরিয়ে সমাজে বেশ আখের গুছিয়ে আসীন হতে পেরেছি। বাকিরা যাদের পেশাগত কারণে তাকে বিশেষ কোনো কাজে লাগে না, তারাও সামাজিক পরিসরে কল্কে পেতে তাঁকে যত্রতত্র ব্যবহার করে বেশ আত্মপ্রসাদ লাভ করে থাকি। এবং আরও আশ্চর্য্যের বিষয় হল এই একটা মানুষ, যাকে দুবেলা স্মরণ না করলেও কোনো না কোনো ভাবে তিনি ঠিকই উঁকি দিয়ে যান আমাদের মগ্নচৈতন্যে, কারণে অকারণে। ফলে সম্বচ্ছর রবীন্দ্রজয়ন্তীর আনুষ্ঠানিক ঢক্কানিনাদের বাইরেও তিনি প্রবল ভাবেই আমাদের মত আধাশিক্ষিত মানুষদের ঘাড়ে চেপে বসেই থাকেন। নামার কোনো লক্ষ্মণই নেই আজ দীর্ঘ এক শতাব্দী হয়ে গেল। গোদের ওপর বিষফোঁড়ের মত আমাদের রাজ্যে পরিবর্তনের নতুন সরকারী ফরমান অনুযায়ী প্রত্যেকটি বড়ো রাস্তার মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যালে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাধ্যতামূলক করে বাজানোর ফলে আমাদের অজান্তেই তিনি আরও বেশি করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছেন প্রতিদিন, আমরা চাই আর না চাই। কিন্তু সত্যি করে এই মানুষটির কাছ থেকে আমরা ঠিক কি চাই? 

কিম্বা আদৌ কি কিছু চাই? 

হয়ত আমরা নিজেরাই নিশ্চিত নই সেই ব্যাপারে। কিংবা নিশ্চিত হলেও মুখ ফুটে প্রকাশ করতে লজ্জা পাই। কারণ এটা তো খুবই সত্য কথা যে আমরা জানি দুছত্র রবীন্দ্রনাথ আউড়ালেই পাচঁজনের কাছে বেশ এলেম দেখানো যায়। যদিও যে বাংলা ভাষাটা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিশেষ কোনো কাজেই লাগে না, সেই একই বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ থেকে মুখস্ত ঝেড়ে দিলেই পন্ডিত বলে পাঁচজনে বেশ মান্যিগণ্যি করে। এমনই তাঁর মহিমা। কিন্তু কি আছে এই মহিমার পেছনে? কোন সে প্রতিভা যাকে মানুষ এত মূল্য দেয়? একটু তলিয়ে দেখলেই দেখতে পাই দুটি বিষয় খুবই ক্রিয়াশীল তাঁর এই মহিমার পেছনে। এক তো তাঁর নোবেল জয়। কারণ আমরা জানি আবিশ্ব এই পুরস্কারের গুরুত্ব। আর আমরা বাঙালিরা চিরকালই পুরস্কারলোলুপ প্রজাতি। ফলে প্রথম নোবেলবিজয়ী বাঙালি হিসেবে আমরা তাঁকে আজও মাথায় করে রেখেছি, এবং রাখবো। অন্তত যতদিন এই পুরস্কারটি আবিশ্ব সমাদৃত থাকবে। এবং দ্বিতীয়টি হল তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত। এই একটি বিষয়ে তিনি খুবই শোচনীয় ভাবেই আমাদের জব্দ করে দিয়েই গিয়েছেন। এবং নিজেও এই বিষয়ে খুবই সচেতন ছিলেন। আর সেকথা বলেও গিয়েছিলেন নিজের বন্ধুমহলেই। বলেছিলেন, বাঙালি যতদিন থাকবে ততদিন তাঁর অন্য সব সৃষ্টি ভুলে গেলেও, এই গান বাদ দিতে পারবে না কিছুতেই। অর্থাৎ একটু সহজ কথায় বললে বলা যায় বাঙালিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত নামক একটি বাঁশ দিয়ে গেলেন বিশ্বকবি। কিন্তু কেন কবির মনে হয়েছিল যে বাঙালি তাঁর অন্য সৃষ্টির প্রতি অবহেলা প্রদর্শণ করলেও তাঁর গানকে কিছুতেই ভুলতে পারবে না। কেন বাঙালিকে এমন একটি জিনিস দিয়ে যেতে হল তাকে এই বলে যে, এর থেকে তোমাদের কোনোদিন নিস্তার নেই?

কারণ সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গরোধ আন্দোলনের সূত্রে। যে আন্দোলনে প্রবল ভবেই সামিল হয়েছিলেন কবি। যে আন্দোলনকে শুধুমাত্র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির আলোতে না দেখে বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখার ডাক দিয়েছিলেন কবি নিজে। আর দুঃখের বিষয় হলেও সেই তখনই সঠিক ভাবে পরিচয় পেয়েছিলেন নিজেরই স্বজাতির। বিচ্ছেদই আমাদের ধর্ম, বিভেদই আমাদের লক্ষ্য, বিদ্বেষই আমাদের অস্ত্র। আর সেই গুণে গুণান্বিত হয়ে সেইদিনই আমরা তাঁকে সেই আন্দোলনের মধ্যেই কোণঠাসা করে বাধ্য করেছিলাম ঘরে ফিরে যেতে। তার উত্তরও নিজের মতো করে দিয়ে গেলেন “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলরে” খুব বড়ো ধরণেরই এক শিক্ষা পেয়েছিলেন কবি তাঁর নোবেলজয়ের প্রাক্কালেই, তাঁরই স্বদেশবাসীর কাছে। এরই একটি প্রত্যক্ষ নমুনা দেখতে পাই আমরা নোবেলজয়ের পর কলিকাতার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে ট্রেনে করে বোলপুরে তাঁকে সম্বর্ধনা দিতে গেলে কবির প্রতিক্রিয়ায়। কেননা কবি সেদিন খুব সঠিক ভাবেই বুঝেছিলেন যে বিদেশী নোবেলের মাহাত্মেই নাগরিক সমাজের এই প্রীতির প্রদর্শনী। এর পিছনে তাঁর কর্ম ও চিন্তার প্রতি এদের কোনো ভালবাসা নেই, তাই এই মেকী প্রীতি প্রদর্শনের থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ছিলেন বিশ্বকবির মত সহনশীল মানুষও। বললেন, “ –যাই হোক, যে কারণেই হোক, আজ ইউরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছেন।

তার যদি কোনো মূল্য থাকে তবে সে কেবল সেখানকার গুণীজনের রসবোধের মধ্যেই আছে, আমাদের দেশের সঙ্গে তার কোনো আন্তরিক সম্বন্ধ নেই। নোবেল প্রাইজের দ্বারা কোনো রচনার গুণ বা রস বৃদ্ধি করতে পারা যায় না। অতএব আজ যখন সমস্ত দেশের জনসাধারণের প্রতিনিধিরূপে আপনারা আমাকে সম্মান উপহার দিতে প্রবৃত্ত হয়েছেন তখন সে সম্মান কেমন করে আমি নির্লজ্জভাবে গ্রহণ করব? এ সম্মান আমি কতদিনই বা রক্ষা করব? আমার আজকের এদিন তো চিরদিন থাকবে না, আবার ভাঁটার বেলা আসবে তখন পঙ্কতলের সমস্ত দৈন্য আবার তো ধাপে ধাপে প্রকাশ হতে থাকবে। 

তাই আমি আপনাদের কাছে করজোড়ে জানাচ্ছি, -যা সত্য তা কঠিন হলেও আমি মাথায় করে নেব, কিন্তু যা সাময়িক উত্তেজনার মায়া, তা আমি স্বীকার করে নিতে অক্ষম। কোনো কোনো দেশে বন্ধু ও অতিথিদের সুরা দিয়ে অভ্যর্থনা করা হয়। আজ আপনারা আদর করে সম্মানের যে সুরাপাত্র আমার সম্মুখে ধরেছেন তা আমি ওষ্ঠের কাছ পর্য্যন্ত ঠেকাব, কিন্তু এ মদিরা আমি অন্তর থেকে গ্রহণ করতে পারব না। এর মত্ততা থেকে আমার চিত্তকে দূরে রাখতে চাই। আমার রচনার দ্বারা আপনাদের যাঁদের কাছ থেকে আমি প্রীতিলাভ করেছি তাঁরা আমাকে অনেক দিন পূর্বেই দূর্লভ ধনে পুরস্কৃত করেছেন, কিন্তু সাধারণের কাছ থেকে নূতন সম্মানলাভের কোনো যোগ্যতা আমি নূতন রূপে প্রকাশ করেছি একথা বলা অসঙ্গত হবে।”

কি দ্ব্যর্থহীন ভাবেই না কবি স্পষ্ট করে দিলে যে, নোবেল প্রাইজ বিদেশীদের প্রীতির উপহার। স্বদেশবাসীর সাথে তার কোনো সম্বন্ধ নেই। নোবেলজয়ের আগে যাঁরা তার কাব্যের গুণগ্রাহী ছিলেন তাঁদের প্রীতিতে তিনি পূর্বেই অভিষিক্ত। নতুন করে নোবেলের মাহাত্মে তাঁর কাব্যে নতুন কোনো রসোত্তীর্ণতা ঘটতে পারে না। ফলে সেদিনের সেই মেকী সম্মর্ধনা প্রত্যাখ্যান করতে হয়ে ছিল তাঁকে। এভবেই জীবনের নানা পর্ব থেকে পর্বান্তরে কবি চিনেছিলেন তাঁর স্বদেশবাসীকে বাস্তবতার পরতে পরতে। 

শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় গড়ে তোলার পর্বেও সে আর এক কাহিনী। কবির স্কুলে যাতে ঘরের ছেলেমেয়েদের কেউ না পাঠায় সেই জন্যে একদল মানুষ নিজের খরচে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের ভয় দেখিয়ে আসতেন, সেকথাই বলেছেন কবি নিজমুখে পরবর্তীতে। তাঁর মংপুবাস কালে একদিন গভীর দুঃখের সাথেই মৈয়েত্রী দেবীকে বলছিলেন কবি, “চারিদিকে ঋণ বেড়ে চলেছে, ঘর থেকে খাইয়ে পরিয়ে ছেলে যোগাড় করেছি, কেউ ছেলে তো দেবেই না, গাড়ী ভাড়া করে অন্যকে বারণ করে আসবে। এইরকম সাহায্যই স্বদেশবাসীর কাছ থেকে পেয়েছি।” শান্তিনিকেতন থেকে পঁচিশে এপ্রিল ১৯৩৪এ কবি অমিয় চক্রবর্তীকে লিখছেন রবীন্দ্রনাথ, “এদেশের মানুষ পদে পদে আমাকে কঠিন আঘাতে জর্জরিত করেছে, নির্মমভাবে আমাকে অপমানিত করেছে, অসহ্য হয়েছে কতবার। নিঃশব্দে আমি তা সহ্য করে এসেছি”। দুই বছর পর সেই অমিয় চক্রবর্তীকেই ৬ই এপ্রিল ১৯৩৬ এর একটি পত্রে লিখলেন, “বাংলাদেশের কাছ থেকে মিথ্যে নিন্দা ও গালি দেশের লোকের বিনা আপত্তিতে আমি যেমন সহ্য করেছি এমন আর কেউ করেনি। এদেশে আমার শেষ বয়স পর্য্যন্ত আমি চিরনির্বাসনদশা ভোগ করেছি”। 

স্বদেশবাসীর কাছে এইভাবেই পুরস্কৃত হয়েছিলেন বিশ্বকবি আজীবন। তাই তাঁর শেষ জীবনে সাহিত্যিক যাযাবরের একটি প্রশ্নের উত্তরে সখেদে বলেছিলেন কবি, তাঁর ‘স্বার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ গানটি পরবর্তীতে লিখলে “স্বার্থক” কথাটি কেটে দিতেন। এমনই গভীর অভিমান নিয়ে চলে গেছেন এই বিশ্বপথিক আমাদেরকে তাঁর যথাসর্বস্ব নিঃশেষে দিয়ে। 

কিন্তু আমরা কি সত্যিই পেরেছি তাঁর সেই দান গ্রহণ করতে? কিম্বা করতে পেরেছি কি, সেই দান গ্রহণের জন্য নিজেদের প্রকৃতই যোগ্য করে তুলতে? না, দুঃখের সাথেই বলতে হচ্ছে আমরা তা পারিনি। কিম্বা আরও একটু তলিয়ে দেখলে দেখব, আমরা সত্যি গ্রহণ করতেই চাইনি তাঁকে, তাঁর নিঃশেষে দিয়ে যাওয়া মনিমুক্তকে, তাঁর অভিপ্রায়কে। আমরা চেয়েছি তাঁর খ্যাতির মহিমাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিতে। আমরা চেয়েছি তাঁর পোশাকে হাত বুলিয়ে নিজেদেরকে সংস্কৃতিসম্পন্ন প্রতিপন্ন করতে। আর করেওছি ঠিক তাই। পরস্পরের পিঠ চাপড়িয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করেছি নিজেদেরকে রবীন্দ্রমনস্ক তকমায় ভূষিত করে। অথচ আমরাই আজীবন নিজেদের প্রতিদিনের জীবনযাপনে স্বেচ্ছায় থেকে গিয়েছি রবীন্দ্রনাথ থেকে দূরবর্তী সুদূরে। আর সেটা যে ঘটবে অনুধাবন করেই গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাই বলে গিয়েছিলেন তাঁর অভিপ্রায়কে গ্রহণ না করলেও তাঁর গানকে আজীবন বহন করতে হবে আমাদেরকেই। যত দূরেই সরে যাই না কেন সমগ্র রবীন্দ্রনাথ থেকেই, জীবনের পরতে পরতে তাঁর গানকে আশ্রয় করেই আমদেরকে অনুধাবন করতে হবে কিভাবে দূরে রেখে দিয়েছি সমগ্র রবীন্দ্রনাথকে। কিভাবে তাঁকে শুধুই ব্যবহার করে চলেছি, একাত্ম হইনি তাঁর সমগ্রতার সাথে। আমাদের রবীন্দ্রনাথ তাই রবীন্দ্রনাথ থেকেই আজও অনেক দূরবর্তী। প্রয়োজনের সামগ্রী মাত্র, জীবনসাথী নন।

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



প্রচ্ছদ নিবন্ধঃ

গানের সুরের রাজপুত্র
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়


‘বাক্য যেখানে শেষ হইয়াছে সেইখানেই গানের আরম্ভ’ – রবীন্দ্রনাথ । 

গান বাঙালির বড় প্রিয় অবলম্বন । সুখে-দুঃখে, আনন্দ-বেদনায়, প্রেমে-বিরহে গানই তার শেষ আশ্রয় । “গানকে ভালোবেসেছে বলেই সে গানকে আদর করে আপন হাতে আপন মনের সঙ্গে মিলিয়ে তৈরী করতে চেয়েছে”। আধুনিক বাংলা গান প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এই কথাগুলি বলেছিলেন ১৯৩৬ এ ‘শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সংগীতের স্থান’ প্রবন্ধে । বাঙালির গান শোনার কান তৈরী হওয়ার সেটা প্রথম যুগ । গত শতকের তিরিশের দশক - বাঙ্গালির পরিশীলিত সাঙ্গীতিক রুচির শুরুয়াত হয়েছে সবে মাত্র । শুধু সাঙ্গীতিক রুচিই বা বলি কেন ? বাঙালি মননের উর্বর ভূমিতে তখন নানান ধারার সৃষ্টির প্রাচুর্য । বাংলা চলচ্চিত্র সবাক হয়েছে, রবীন্দ্র প্রভাব বলয়ের বাইরে আধুনিক বাংলা কবিতার পথচলা শুরু হয়েছে বুদ্ধদেব বসু, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুধীন্দ্র নাথ দত্ত প্রমুখের প্রবল আবির্ভাবে, বাংলা গানে লালচাঁদ বড়াল, কৃষ্ণ চন্দ্র দে, আঙ্গুর বালা, কমলা ঝরিয়া, ইন্দুবালা, কে মল্লিকদের যুগ পেরিয়ে এসেছেন পঙ্কজ কুমার মল্লিক, যুথিকা রায়, সুধীরলাল চক্রবর্তী, জগন্ময় মিত্র, শচিনদেব বর্মণরা । 

তিরিশ থেকে ষাটের দশক ছিল বাংলা গানের ‘সোনার দিন, প্রাণভরে আধুনিক বাংলা গান শোনার দিনও । আর বাংলা গানের সেই সোনার দিনের নির্মাণ যাঁদের হাতে হয়েছিল তাঁদের এক অগ্রজন ছিলেন শচিন দেববর্মণ । আধুনিক বাংলা গানের গায়কীর অনেকটাই তৈরী করে দিয়েছিলেন শচিন দেববর্মণ । হওয়ার কথা ত্রিপুরার রাজা, হয়ে গেলেন আধুনিক বাংলা গানের মুকুটহীন রাজা । ‘সব ভুলে যাই তাও ভুলিনা বাংলা মায়ের কোল’ আজও যে গান তার সুরের মায়ায় আমাদের দুলিয়ে দেয় । 

ইতিহাস বিস্মরণের এই দিনে কতজনই বা মনে রাখি সেই সুরের যাদুকরকে ? আমাদের সংবেদনশীলতা কি ক্ষণিকের জন্যেও চমকে উঠেছিল এই সংবাদ জেনে যে সেই মায়াবী সুরের স্রষ্টার সহধর্মিনী শিল্পী নবতিপর মীরা দেববর্মণের শেষ জীবনের আশ্রয় হবে মুম্বাই শহরতলীর বারো ফুট বাই দশফুট ঘরের এক বৃদ্ধাশ্রমে, যার ত্রিপুরার রাজবধু হওয়ার কথা ছিল ? আর মুম্বাই ফিল্ম জগতে শচিনদেবের অবদান আর নিজেরও প্রতিষ্ঠার মূলে যে মানুষটার অবদান সবচেয়ে বেশি তাও ভুলে গিয়েছিলেন শচিনদেবেরই পুত্রবধু আশা ভোসলে । সে সময়ে রাহুলদেবও চলে গেছেন । মুম্বাই ফিল্ম জগতও চমকে ওঠেনি । বৃদ্ধাশ্রমের কতৃপক্ষও জানলেন কে এই বৃদ্ধা, যখন মীরাকে সম্মানিত করার কথা জানিয়ে ত্রিপুরা সরকারের চিঠি তাদের ঠিকানায় পৌছেছিল । 

শচিনদেবের জন্ম কুমিল্লাতে । পিতা ঈশাণ চন্দ্র মাণিক্যের মৃত্যুর পর সিংহাসন থেকে বঞ্চিত হয়ে চলে আসেন কুমিল্লাতে । সেখানেই জন্ম শচিনদেবের । বাল্য ও কৈশোরে দিনগুলো কাটে কুমিল্লাতেই, কলেজ শিক্ষাও । পিতা চেয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার পর পুত্র আগরতলায় ফিরে এসে রাজকার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন , কিন্তু শচিন আবদ্ধ হলেন সুরের মায়ায় । চেতনায় তখন ত্রিপুরার বাঁশের বাশি, ভাটিয়ালির সুর, মাঝিমাল্লাদের জীবন ও জীবিকার সুর, গোমতী নদীর অপরূপ ছন্দ, কুমিল্লার গাছ-গাছালি, নদী-নালা আর মাঝি-মাল্লাদের মাটির গন্ধমাখা সুর । জীবন সায়াহ্নে শচিনদেব আত্মকথায় বলেছিলেন “কেন জানিনা জ্ঞান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাটির টান অনুভব করে মাটির কোলেই থাকতে ভালোবাসতাম । আর বড় ভালো লাগত সেই সহজ সরল মানুষগুলোকে, গুরুজনরা যাদের সাধারণ লোক। যাইহোক, অসাধারণের দিকে না ঝুঁকে আমি ওই সাধারণ লোকের মাঝেই নিঃশেষে বিলিয়ে দিয়ে তাদের সঙ্গে এক হয়ে গেলাম শৈশব থেকেই”(‘শচিন কর্তা’/পান্নালাল রায়) । 

আসলে শচিনদেবের সঙ্গে কুমিল্লার সংস্পর্শ না বললে তাঁর সম্পর্কে কিছু বলা সম্পূর্ণ হয় না । আগরতলা তাঁকে দিয়েছিল পারিবারিক আভিজাত্য, কুমিল্লা দিয়েছিল সুর আর বাকি জীবনের চলার ছন্দ, কলকাতা দিয়েছিল শচিনদেবের প্রতিষ্ঠা আর মুম্বাই দিয়েছিল যশ ও খ্যাতির আকাশ । ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত আত্মকথায় তিনি নিজেই লিখেছিলেন “খতিয়ে দেখলে আমার এ জীবনকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায় । শৈশব ও কৈশোরের দুরন্তপনা গোমতী নদীর তীরে কুমিল্লায়, যৌবনের উন্মত্ততা ভাগীরথীর তীরে কলকাতায় – যা জীবনে প্লাবন এনে দিয়েছিল এবং প্রৌঢ়ত্বের ছোঁয়া দিল আরব সাগর - এই মুম্বাইতে । রাজ পরিবারের আভিজাত্য গায়ে মেখেও শচিনদেব মাটির প্রতি মমত্ব বোধ আর মাটির গন্ধমাখা সুর আহরণ করে আধুনিক বাংলা গানের পথচলার কায়দাটাই যেন নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন । কলকাতা বেতার কেন্দ্রে প্রথম গান গাইলেন ১৯২৫এ, তখন সবে কলকাতা বেতারের প্রতিষ্ঠা হয়েছে ১৯২৪এর অগস্ট মাসে । শচিনদেবের প্রথম গ্রামফোন রেকর্ড প্রকাশিত হল ১৯৩২এ হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে । তাঁর কিছুটা আনুনাসিক কন্ঠস্বরের জন্য প্রথমে তখনকার মুখ্য রেকর্ড কোম্পানী এইচ এম ভি তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছিল । হিন্দুস্থান থেকে প্রথম রেকর্ড প্রকাশের পর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি । 

ত্রিপুরার রাজ পরিবারের সন্তান হওয়ার পারিবারিক আভিজাত্য শচিনদেবের শিল্পী হয়ে ওঠা বা প্রতিষ্ঠায় অনুঘটকের কাজ করেনি বিন্দুমাত্র, বরং কিছুটা অভিমানই ছিল রাজ পরিবারের প্রতি । ১৯৪৪এ স্থায়ীভাবে মুম্বাই চলে যাবার পর ত্রিপুরার প্রতি ভালোবাসার টান থাকলেও রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষীণ হতে থাকে । ১৯৪৬এর পর শচিনদেব আর আগরতলায় যাননি । কোন রাজপরিবারের আভিজাত্যের ছাপ না থাকা মীরা দাশগুপ্তাকে বিবাহ আগরতলায় তাঁর পরিজনরা মেনে নেয় নি । তাঁর অভিমান ও রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষীণ হয়ে যাওয়ার কারণ হয়তো এটাই । সহধর্মিনী মীরার সঙ্গীত শিক্ষার প্রথম পাঠ শান্তি নিকেতনে, পরে শচিনদেবের কাছেই সঙ্গীত শিক্ষা । কলকাতায় থাকা কালীন ১৯৩৮এর ফেব্রুয়ারিতে শচিনদেব বিবাহ করেন ছাত্রী মীরাকে । মীরা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন, শান্তিনিকেতনে অমিতা সেনের কাছে নাচ ও অনাদি দস্তিদারের মত মানুষের কাছে রবীন্দ্র সঙ্গীত শিখেছিলেন । নিজে গানের রেকর্ড করেছিলেন এবং শচিনদেবের সহকারী ছিলেন, নিজেও মুম্বাইতে ফিল্মএ গান করেছেন, লিখেছেনও অনেক গান ।

এক আশ্চর্য সাঙ্গীতিক আভিজাত্যের মোড়ক তাঁকে মর্যাদা মন্ডিত করেছিল । কৃষ্ণ চন্দ্র দের কাছে গান শিখেছিলেন, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নিয়েছিলেন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের কাছে । হিন্দি সিনেমার সঙ্গীত পরিচালনায় গগনচুম্বি খ্যাতি পেয়েছিলেন, কিন্তু নিজেকে এক মর্যাদামন্ডিত ‘ধুতি-পাঞ্জাবি পরা বাঙালি’ ছাড়া আর কিছুই ভাবতে দেননি কাউকে, কলকাতার শহুরে বাংলা’ ভাষাও রপ্ত করার কোন চেষ্টা করেন নি , ভোলেননি কুমিল্লার ভাষাভঙ্গি । “সব ভুলে যাই তাও ভুলি না বাংলা মায়ের কোল” এ শুধু তাঁর গানের পংক্তি নয়, আশ্চর্য বৈভব মন্ডিত শচিনদেবের সঙ্গীত জীবনের চলার ছন্দ । আবার এপার বাংলার প্রতি অনেক অভিমানও ছিল শচিনদেবের । বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক নারায়ন চৌধুরীকে বলেছিলেন “... আজ যদি কেউ আমাকে কলকাতা থেকে প্রস্তাব করে পাঠাত, তোমাকে পাঁচশো টাকা করে মাসোয়ারা দেব, তুমি আবার আমাদের মধ্যে ফিরে এসো, আমি তন্মুহুর্তে মুম্বাই-এর তল্পিতল্পা গুটিয়ে কলকাতা চলে আসতুম – আবার সেই পুরনো দিনের মত গানে গানে মেতে উঠতুম’ । জীবন সায়াহ্নে নিজের উপলব্ধি লিখে গেছেন তিনি “নিজের শুধু এই পরিচয় যে আমি বাংলা মায়ের সন্তান এবং আমার সুরসৃষ্টি সমগ্র ভারতবাসীর সম্পদ – আমার সুর ভারতবর্ষের প্রতীক” (সূত্রঃ’ শচিন কর্তা’/পান্নালাল রায়) । 

শচিনদেব প্রথম গানের রেকর্ড করেন ১৯৩২এ আর শেষ গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয় ১৯৬৯এ । এই দীর্ঘ ৩৭ বছরে শচিনদেব রেকর্ডে বাংলা গান গেয়েছেন মাত্র ১৩১টি । ১২৭টি একক এবং ৪টি দ্বৈত কন্ঠে স্ত্রী মীরার সঙ্গে । এর একটা কারণ শচিনদেব অন্যের সুরে গান প্রায় গাইতেনই না, এবং নিজের পছন্দ মত গীতিকার ছাড়া অন্যের গীত রচনাতেও গান গাইতেন না । বাংলা গানের জগতে শচিনদেবের গৌরবময় প্রতিষ্ঠা এবং আধুনিক বাংলা গানের মোড় ঘুরিয়ে দেবার ঘটনায় আরো দুজন মানুষের কথা একই সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছেন – তারা হলেন শচিনদেবের কুমিল্লার সাথী সুরসাগর হিমাংশু দত্ত ও গীতিকার অজয় ভট্টাচার্য । তাঁর গাওয়া ১৪১টি বাংলা গানের মধ্যে সুরসাগর হিমাংশু দত্তর সুরে ৮টি, কাজী নজরুলের সুরে ৬টি ছাড়া সব গানই গেয়েছিলেন নিজের সুরে । শচিনদেবের বেশিরভাগ লোকপ্রিয় গানের গীত রচনা করেছিলেন অজয় ভট্টাচার্য । আধুনিক বাংলা গানের গায়ন শৈলীতেই এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন । শুধুমাত্রে ঈষৎ আনুনাসিক ও দরাজ কন্ঠস্বরের জন্যই নয়, বাংলার মাটি ও মানুষের সঙ্গে তাঁর নিবিড় আত্মীয়তার ফলে বাংলার লোক সুর আর মাঝিমাল্লাদের সঙ্গে মিশে তাদের সুর তুলে এনেছিলেন আর আশ্চর্য দক্ষতায় শাস্ত্রীয় সুরের সঙ্গে মাটির সুরের মিশ্রণ ঘটিয়ে বাংলা গানকে দান করেছিলেন অপার ঐশ্বর্য । শচিনদেব তাঁর জীবন কথায় লিখে গেছেন “১৯৩০ থেকে ১৯৩৬ পর্যন্ত এই ৫/৬ বছরে লোকসঙ্গীত ও ভারতীয় মার্গসঙ্গীতের সংমিশ্রনে নিজস্ব ধরণের সুর রচনা করলাম – যা অন্য কারো সঙ্গে মিললো না । এইভাবে আমি আমার নিজস্ব গায়কী সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলাম”(সূত্র- ‘শচিনকর্তা’/পান্নালাল রায়) । এই পর্বে ‘আমি ছিনু একা বাসর জাগায়ে’(১৯৩৬), কিংবা ‘প্রেমের সমাধি তীরে’ (১৯৪০)র মত রাগাশ্রয়ী আধুনিক গান কিংবা লোক সুরের মিশ্রণে ‘সেই যে বাঁশি বাজাবার দিনগুলি’(১৯৫১), ‘ঝিলমিল ঝিলমিল ঝিলের জলে’(১৯৫১), কিংবা ষাটের দশকের শেষ দিকে রেকর্ড করা ‘মন দিল না বধু’, ‘বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে হৃদয়ে দিয়েছ দোলা’ এখনো গানপ্রিয় বাঙালির হৃদয়ে দোলা দেয় । অথচ আমাদের অপার বিস্ময় বাংলা ছায়াছবি শচিনদেবের সুরের ঐশ্বর্য প্রায় বর্জনই করেছিল । ১৯৩২এ বাংলা ছায়াছবি সবাক হওয়ার পর ১৯৩৮এর মধ্যে মাত্র ৫/৬টি বাণিজ্যিক ভাবে অসফল বাংলা ছায়াছবিতে তিনি গান গেয়েছিলেন ।

একথাও মনে করা যেতে পারে যে শচিনদেবের সাঙ্গীতিক রুচি ও আভিজাত্য সেকালের ছায়াছবির জগতের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি । তিনি অন্যের সুরে গান করতেন না । সঙ্গীত পরিচালক অন্য কেউ হলেও তাঁর গীত গানের সুর তিনি নিজেই করতেন । শুধুমাত্র একটি ছায়াছবিতে নজরুল ইসলামের সুরে একটি গান করতে সম্মত হয়েছিলেন । আর একটি সর্ত থাকত তাঁর, তাঁর গাওয়া গান ছবির কোন চরিত্রের কন্ঠে থাকবে না, শুধুমাত্র নেপথ্য দৃশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে গীত হবে । কিন্তু ক্ষতি যে বাংলা চলচ্চিত্রের হয়েছিল তাতে সংশয় নেই । বাংলা ছায়াছবির সঙ্গীত পরিচালক হিসাবেও শচিনদেব কোন সুযোগ পাননি । ১৯৩২এ বাংলা ছায়াছবি সবাক হওয়ার পর দুটি অসফল ছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন, তারপর কোন প্রযোজক, পরিচালক তাঁকে ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ দেন নি । কোন ডাক না পেয়ে কিছুটা অভিমান নিয়েই বাংলা ছেড়ে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন । ১৯৪২এ মুম্বই যাওয়ার প্রথম ডাক পেয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন । চেয়েছিলেন বাংলাতেই থাকার । কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্র জগত থেকে কোন ডাক না পেয়ে অভিমানাহত হয়ে ১৯৪৪এ মুম্বাই চলে গেলেন পাকাপাকি ভাবে । ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর আত্মকথনে (মার্চ ১৯৬৯) শচিনদেব লিখেছিলেন “বাংলা চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করার আকাঙ্খা ছিল খুব । কিন্তু কোন সুযোগই পাচ্ছিলাম না ......। কোথাও কোন চলচ্চিত্র সংস্থা আমাকে সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ না দেওয়াতে মনে খুবই দুঃখ হয়েছিল” । তাই ১৯৪৪এ দ্বিতীয়বার যখন মুম্বাই থেকে ডাক পেলেন, আর ফিরিয়ে দিলেন না ।


তারপর হিন্দি সিনেমার গান তাঁর সুরের জাদুতে কি অসামান্য উচ্চতা স্পর্শ করেছিল তা তো ইতিহাস হয়ে আছে । মুম্বাই সিনেমার গান ঐশ্বর্যময়ী হয়ে উঠলো বাংলার মাটির সুরের স্পর্শে আর বাংলা ছায়াছবি কোন শচিনদেবের ছোঁয়া পেল না । কিন্তু যেটুকু পেয়েছে বাংলা সঙ্গীত জগত তাই বা কম কি ? শচিনদেব চলে গেছেন আজ প্রায় চার দশক হ’ল(মৃত্যু- ৩১ অক্টবর ১৯৭৫)। বাংলা সঙ্গীত ভান্ডারে যে ১৩১টা গান রেখে গেছেন শচিনদেব, আজও সব প্রজন্মের মানুষ অবাক বিস্ময়ে শোনেন, দোলায়িত হন তাঁর সুরের মায়ায় ।

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

যূথিকা রায় : তাঁর গান ও সেই সময়
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহে কলকাতার মানুষ যখন দক্ষিণ কলকাতার রামকৃষ্ণ সেবাপ্রতিষ্ঠান হাসপাতাল চত্বরে হামলে পড়েছে অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের শারীরিক অবস্থা জানার জন্য, তখনই ঐ হাসপাতালের কোন একটি ওয়ার্ডে সুচিত্রা সেন অভিনীত ‘ঢুলি’ ছায়াছবির এক নেপথ্য সঙ্গীত শিল্পী, ৯৩ বছরের এক বৃদ্ধা মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে শায়িত ছিলেন সকলের আগ্রহের অন্তরালে ।

সুচিত্রা সেনের মৃত্যুর তিন সপ্তাহ পরে তিনি মারা গেলেন ৬ই ফেব্রুয়ারি রাত্রি এগারোটায় । চলে গেলেন আধুনিক ‘মীরা বাঈ’ যূথিকা রায় । না, ‘ছায়াছবির নেপথ্য গায়িকা’ এটা কোন পরিচয়ই নয় যূথিকা রায়ের । বাঙালি যখন সবে গান শুনতে শুরু করেছে রেডিও বা কলের গানে, যূথিকা রায় সেই সময়ের সঙ্গীত শিল্পী । বলা সঙ্গত যে, বাংলা গানের যথার্থ আধুনিক হয়ে ওঠা বা বাংলা গানে পরিশীলিত সাঙ্গীতিক রুচি তথা আধুনিকতার নির্মাণ যাঁদের হাতে হয়েছিল তাদেরই একজন ছিলেন যূথিকা রায় ।

১৯৫০/৫২এ আট কি দশ বছর বয়সে তখনও গান শোনার কান তৈরী হয়নি । একটা চারচৌকো কাঠের বাক্স যাকে রেডিও বলা হ’ত, তাতে যখন মীরার ভজন ভেসে আসতো ‘মায়নে চাকর রাখো জী’ কিংবা ‘মেরে তো গিরিধারি গোপাল’ তখন কে মীরা বাঈ এসব জানার কথা নয় আমার । এবং বলতে লজ্জা নেই এইসব গান যিনি গাইতেন তাঁকেই ‘মীরাবাঈ’ বলে জানতাম । অনেক পরে চিতোর বেড়াতে গিয়ে গাইড যখন একটা ছোট ঘরের ভগ্নাবশেষ দেখিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল ঐ ঘরে বসেই নাকি মীরা তাঁর গিরিধারী নাগরের ভজনা করতেন, তখন যূথিকা রায়ের কথা আর তাঁর কন্ঠস্বর সামনে ভেসে আসতো । একেই বোধহয় ‘লিজেন্ড’ হয়ে যাওয়া বলে ! কিন্তু মীরার ভজন দিয়ে শুরু হয়নি তাঁর সাঙ্গীতিক জীবন, শুরু হয়েছিল আধুনিক বাংলা গান দিয়ে ।

যূথিকা রায়ের জন্ম ১৯২০র ১৬ই এপ্রিল হাওড়া জেলার আমতায় । ঐ একই বছরে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা গানের দুই প্রবাদপ্রতীম সঙ্গীত শিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় আর মান্না দে । মাত্র সাত বছর বয়সে বাবার হাত ধরে কলকাতায় এসেছিলেন বেতারে গান গাইতে । কলকাতা বেতারের তখন নিতান্ত শৈশব কাল । মাত্র একবছর আগে বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার, পঙ্কজ কুমার মল্লিক প্রমুখের ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলকাতা রেডিওর পত্তন হয়েছে ১৯২৭এর ১৬ই অগস্ট । ঐ বছরেই বৃটিশ ভারতে প্রথম রেডিও সম্প্রচার শুরু হয় বোম্বাই বেতার কেন্দ্র থেকে ২৩শে জুলাই । তখনও প্রায় কারো ঘরেই রেডিও সেট পৌঁছায়নি । কানে হেডফোন লাগিয়ে বেতারের সম্প্রচারিত কথা শোনা যেতো । কিছু সম্ভ্রান্ত ঘরে রেডিও সেট ঢুকলো আরো কিছুদিন পরে । তখন বিনোদন মূলক বাংলা গান বলতে গ্রামফোন রেকর্ডে লালচাঁদ বড়াল, কৃষ্ণ ভামিনী, ইন্দুবালা, হরিমতী, কমলা ঝরিয়ার প্রেম ও ছলনামূলক ও দেহতত্বের গান, কৃষ্ণ চন্দ্র দের কীর্তনাঙ্গের গান, আর ক্বচ্চিত ‘রবিবাবুর গান’ লেবেলে দু একটি রবীন্দ্রনাথের লেখা গান । তখনও বাংলা গানের পরিশীলিত গায়ন-রুচি তৈরী হয় নি । বাংলা রেকর্ডের গানের বয়সই তখন মাত্র ছাব্বিশ বছর । ১৯০২ সালে কলের গানের প্রথম রেকর্ড চালু হওয়ার পর পরিশীলিত গায়ন-রুচি তৈরী হতে লেগে গিয়েছিল আরো কুড়ি পঁচিশটা বছর ।

মাত্র ১৪ বছর বয়সে যূথিকা রায় প্রথম গ্রামফোন রেকর্ডে গান গাইলেন ১৯৩৪এ কাজী নজরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে । নজরুল তখন কাব্যভুবন থেকে চলে এসে গ্রামোফোন কোম্পানির মাস মাইনের সঙ্গীত পরিচালক । গ্রামোফোন কোম্পানির সর্বময় কর্তা । বস্তুত বাংলা গানের স্বর্নযুগের সূচনা হয়েছিল নজরুলের হাতেই । কুকুর-মার্কা এইচ এম ভি’র লেবেলে যুথিকা দুটি গান রেকর্ড করলেন প্রণব রায়ের কথা ও কমল দাশগুপ্তের সুরে, ‘আমি ভোরের যূথিকা’ এবং ‘সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে’ । যূথিকা রায়ের সেই প্রথম রেকর্ডের গান প্রসঙ্গে বাংলা গানের জীবন্ত তথ্যকোষ প্রয়াত বিমান মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ উদ্ধৃত করি,

“যূথিকা রায়ের নামে বাজারে রেকর্ড বেরুল - আমি ভোরের যূথিকা আর ওই বিখ্যাত সাঁঝের তারকা আমি পথ হারায়ে - যে গানটাকে এখনকার গবেষক বিশেষজ্ঞরাও অনেকে, আধুনিক বাংলা গান সরণীটির প্রথম মাইলফলক বলে চিহ্নিত করেছেন। কারুর কাছে এটা হয়ত প্রশ্নাতীত নাও হতে পারে, তবু এ গান যে ইতিহাসের উপাদান হয়ে গেছে - তাতে কিন্তু কোনরকম দ্বিমত নেই। সেই বোধহয় রেকর্ডের বাংলা গানে, প্রথম অর্কেস্ট্রা তৈরি হল।... তা, রেকর্ডখানা বাজারে বেরুল। আর মাত্র তিন মাসের মধ্যে যূথিকাদির এই রেকর্ডখানা ষাট হাজার কপি বিক্রী হয়ে গিয়ে বাজারে রীতিমত হৈ চৈ ফেলে দিল। রাতারাতি যূথিকাদি হয়ে গেলো আর্টিস্ট, স্টার।’’ (‘বিমানে বিমানে আলোকের গানে” : শীতাংশুশেখর ঘোষ, পৃ ১৫৪-৫৫)।

তিরিশের দশক বাংলা গানের সুবর্নযুগের সূচনাকাল । ১৯৩২এ শচীন দেববর্মণ প্রথম বেতার ও গ্রামফোনের গানে প্রবেশ করলেন, ১৯৩২এই বাংলা চলচ্চিত্র নির্বাক যুগ পেরিয়ে সবাক হ’ল, ১৯৩৭এ ‘মুক্তি’ ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালক পঙ্কজ কুমার মল্লিক ছায়াছবিতে রবীন্দ্রনাথের গানের প্রয়োগ ঘটালেন । শচীন দেববর্মণ ও সুরসাগর হিমাংশু দত্তের যুগলবন্দির সুরবৈচিত্রে বাংলা গান যথার্থ অর্থেই আধুনিক হয়ে উঠলো। বাংলা গানের কথায় কাব্যের লাবণ্য এল এই সময়ের গানে । এই পর্বেই যূথিকা রায় আধুনিক বাংলা গানের সুবর্ন যুগের নির্মাণে অবিসংবাদী ভূমিকা রেখে গেলেন তাঁর স্বকীয় গায়নশৈলী ও কন্ঠ মাধুর্যের গুনে । ১৪বছর বয়সে প্রথম রেকর্ডের অভূতপূর্ব সাফল্যের পর গ্রামফোন কোম্পানি একের পর এক কমল দাশগুপ্তর সুরে আধুনিক বাংলা গানের রেকর্ড করাতে লাগলেন । সুরকার কমল দাশগুপ্তর প্রতিষ্ঠার পেছনে যূথিকা রায়েরও অবদান বড় কম ছিলনা । কারণ যূথিকা রায়ের প্রায় সব গানের সুরকার ছিলেন তিনি । যূথিকা রায়ের সংগীতজীবনের প্রায় সবটাই জুড়ে ছিলেন কমল দাশগুপ্ত । নজরুল ইসলাম তাঁকে নিয়ে এসেছিলেন আর পরবর্তীতে শুধুই কমল দাশগুপ্ত । প্রথম রেকর্ড করেছিলেন নজরুল ইসলামের লেখা ও সুরে কিন্তু যে কোন কারণে সেই রেকর্ড প্রকাশিত হয়নি । হয়তো স্বয়ং নজরুলেরই তা পছন্দ হয়নি । তিনিই তখন কমল দাশগুপ্ত কে সুর করতে বলেন । ১৯৩৯এ নজরুল ইসলাম অসুস্থ হয়ে পড়লেন । তারপর তো বাক-শক্তিই হারালেন ।

যূথিকা রায় নজরুলের অনেকগুলি গান রেকর্ডে গেয়েছিলেন । তাঁর গাওয়া নজরুলের গানের মধ্যে নিজের সবচেয়ে প্রিয় গান ছিল ‘ওরে নীল যমুনার জল’ এবং ‘তোমার কালো রূপে যাক না ডুবে সকল কালো মম, হে কৃষ্ণ প্রিয়তম’ । দুটি গানেরই সুর করেছিলেন কমল দাশগুপ্ত ।

এই সময় থেকে যূথিকা আধুনিক বাংলা গান থেকে ভক্তিমূলক – প্রধানতঃ ভজন গানে চলে এলেন । যুথিকা স্মৃতিচারণ করেছেন “এরপর প্রথমে কমল দাশগুপ্ত আমাকে একটা মীরার ভজন শেখালেন, সেই মীরার ভজন যখন দাঁড়িয়ে গেল, পপুলার হলো, ফার্স্ট যখন ‘মীরা কে প্রভু সাঁচী দাসী বানাও’ - এই গানটা বেরিয়ে পপুলার হলো, তখন ওই গ্রামোফোন কোম্পানির থেকে বলা হলো, যতগুলো মীরার ভজন আছে সব যূথিকাকে দিয়ে গাওয়ানো হবে ।

চল্লিশের দশক –বাংলা গানের ভুবন যেন পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে । হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, জগন্ময় মিত্র, সত্য চৌধুরী, সুধীরলাল চক্রবর্তী, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, বেচু দত্ত প্রমুখ অনেক শিল্পী, শৈলেশ দত্তগুপ্ত, মোহিনী চৌধুরী, অজয় ভট্টাচার্যর মত গানের কথাকার, দুর্গা সেন, অনুপম ঘটক, নচিকেতা ঘোষ, সলিল চৌধুরীর মত সুরকার সেই সময়ের ফসল ।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায় পনেরো বছর বয়সে প্রথম বেতারে গান গাইলেন ১৯৩৫এ, ১৯৩৭ এ তাঁর প্রথম গ্রামোফোন রেকর্ড বেরিয়ে গেল ‘কথা কয়োনাকো, শুধু শোন’ ও ‘জানিতে যদিগো তুমি’ । বাংলা গানের ভুবনে অনেক শিল্পীর আবির্ভাব সত্বেও আধুনিক বাংলা গানের বাইরে যে অন্য ধারার গান সেখানে গায়নশৈলীর স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে রইলেন যূথিকা রায় ।

তাঁর সঙ্গীত জীবনের প্রথম পর্বের গানগুলিতে রোমান্টিকতার সঙ্গে পাওয়া যায় একটা বিষাদ বিষন্নতার ছবি, আর ভজন গানে তাঁর গায়কীতে বিভোর, তন্ময় আত্মনিবেদন । একের পর এক মীরার ভজন গাইতে গাইতে ‘আধুনিক মীরা বাঈ’এর পরিচিতি পেয়ে গেলেন যূথিকা রায় । প্রায় তাঁর সমকালেই পন্ডিত ডিভি পালুশকর কিংবা অনেক পরে অনুপ জলোটা এবং আরো অনেক শিল্পী ভারতজোড়া খ্যাতি পেয়েছেন কিন্তু মীরার ভজন গানে যূথিকা রায়ের যে শ্রদ্ধার আসন তাকে স্পর্শ করতে পারেননি কেউ । এই ‘আধুনিক মীরা’ হয়ে ওঠা তাকে বিরল সম্মান এনে দিয়েছিল । সেসব কথা যুথিকা নিজেই লিখে গেছেন তার স্মৃতিচারণ মূলক বই “আজও মনে পড়ে”তে এবং নানান সাক্ষাৎকারে ।

১৯৪৭এর পনেরোই অগষ্ট । সেদিন রেডিওতে যুথিকার গানের সিটিং ছিল । ঘটনাক্রমে সেদিন লালকেল্লায় স্বাধীন ভারতে প্রথম জাতীয় পতাকা তুলবেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু । যুথিকার পনেরো মিনিটের রেডিও সিটিং শেষ হয়েছে, ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত । তখনই টেলিফোনে সংবাদ এলো, প্রধান মন্ত্রী নেহেরু চাইছেন জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পুরো সময়টা রেডিওতে যেন যুথিকা রায় গান গাইতে থাকেন । নেহেরু তখন তিনমূর্তি ভবন থেকে লালকেল্লার পথে রওনা দিয়েছেন । যূথিকা আবার বসলেন গান গাইতে । গান্ধীজীর প্রিয় রামধুন ভজন ও দেশভক্তিমূলক সহ সাত/আটটি গান গেয়েছিলেন জাতীয় পতাকা উত্তোলনের সময় । যূথিকার এমনই প্রবল জনপ্রিয়তা ছিল । নেহেরু নিশ্চয়ই জানতেন গান্ধীজী তাঁর দৈনিক প্রার্থনার আগে যূথিকার ভজন শুনতেন ।

১৯৪৬এ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় গান্ধীজী কলকাতায় এসেছিলেন সত্যাগ্রহে । মঞ্চে ডেকে নিয়েছিলেন যূথিকাকে, তাঁর ভাষণের আগে গান গেয়েছিলেন যূথিকা রায় ।

তখন ছায়াছবিতে গান গাওয়া যে কোন শিল্পীর খুব কাঙ্খিত ছিল, শিল্পীর জনপ্রিয়তার একটা মাপকাঠি ছিল ছায়াছবিতে গান করা । কিন্তু ছায়াছবিতে গান করা যূথিকাকে টানেনি একদম । তিনি যে তন্ময়তায় ভজন গাইতেন তেমন পরিবেশ তখনকার সিনেমায় থাকতো না বলেই মনে করতেন যূথিকা । এ ব্যাপারে তাঁর মায়ের রক্ষণশীলতাও তাঁর সিনেমায় গান না করার একটা কারণ ছিল । তবু দুটি ছায়াছবিতে তিনি নেপথ্য সঙ্গীতে ছিলেন । তখনকার প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক দেবকী কুমার বসুর হিন্দি ছবি ‘রত্নদীপ’ ছবিতে, মুক্তি পেয়েছিল ১৯৫১তে এবং পিনাকী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীতপ্রধান ছবি ‘ঢুলি’, ১৯৫৪ তে । তাঁর দীর্ঘ সঙ্গীত জীবনে আর কোন বাংলা বা হিন্দি ছায়াছবিতে তিনি গান করেননি ।

বস্তুত পঞ্চাশ দশকের শেষ থেকেই তিনি অনুষ্ঠানে গান করা ছাড়া রেকর্ডের গান করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন । তাঁর প্রায় সব গানের সুরকার কমল দাশগুপ্তের সৃষ্টিশীলতাও কমে যায় । অসুস্থতার কারণে রেকর্ডে সুর করা বন্ধ করে দিলেন । যূথিকাও গানের নতুন গান রেকর্ড করা বন্ধ করে দিলেন । এই সময় শ্যামল গুপ্তর লেখা কয়েকটি গানে নিজে সুরও দিয়েছিলেন যূথিকা । আর অন্যকোন সুরকারের সুরে যূথিকাতো গানই করেনইনি । কমল দাশগুপ্ত রেকর্ডের গানে সুর করা বন্ধ করে দেওয়ার পর গ্রামফোন কোম্পানী তাঁর ইচ্ছামত যে কোন ট্রেনারের সঙ্গে গান করার অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু যূথিকা অন্য কোন ট্রেনারের প্রশিক্ষণে গান করায় সম্মত হননি যদিও তখনও তাঁর কন্ঠে গান ছিল আর তাঁর গানের জনপ্রিয়তা ও চাহিদা ছিল । তখন তিনি রজনীকান্ত ও অতুলপ্রসাদের গানে চলে এলেন । এইসময় বাংলা ও হিন্দি ছাড়া উর্দু ও তামিল ভাষাতেও ভক্তিমূলক গান করেছিলেন তিনি । কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান করেননি । অবশ্য যূথিকা রায়ের সঙ্গীত জীবনের শীর্ষ সময়ে রবীন্দ্রনাথের গান বাঙ্গালির কাছে এখনকার মত সর্বগ্রাসী ছিলই না বরং বলা ভালো ১৯৬১তে তাঁর শতবার্ষিকীর আগে বাঙ্গালির রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার কানই তৈরী হয়নি । অথচ মজার কথা সাত বছর বয়সে বেতারে যূথিকার প্রথম গানটিই ছিল রবীন্দ্র নাথের ‘আর রেখোনা আঁধারে, আমায় দেখতে দাও’ ।

জন্ম হাওড়া জেলার আমতা, পরিবারের আদিবাড়ি খুলনা জেলার সেনেটি গ্রাম । শৈশবশিক্ষা, গানকে ভালোবাসার শুরু সেখানেই, তারপর ১৯৩০ থেকে কলকাতায় পাকাপাকি বাস । আর গানেরতো কোন দেশ কাল হয় না । বয়সও হয়না । বিস্ময় লাগে, এই সেদিন, ২০১৩র পূজোর ঠিক আগে, ৯৩বছর বয়সে মুম্বাইতে গানের অনুষ্ঠান করলেন । সেটাই তাঁর শেষ সঙ্গীতানুষ্ঠান । রেকর্ডে গান করা ছেড়ে দেবার অনেকদিন পরে বিশেষ অনুরোধে একটি সাঁইবাবার ভজন রেকর্ড করেন ১৯৭৬এ এবং এটি তাঁর শেষ রেকর্ডের গান ।

সময়ের স্রোত হয়তো আমাদের অনেক কিছুই ভুলিয়ে দেয়, তার মধ্যে অস্বাভাবিকতাও নেই কিছুমাত্র, তবু শিল্পীর সৃষ্টি বেঁচে থাকে । যতদিন গানশোনা মানুষ ‘মীরার ভজন’ শুনতে চাইবেন, তাঁকে বোধকরি ‘আধুনিক মীরা’ যূথিকা রায়ের গানের কাছে যেতে হবে ।

প্রচ্ছদ নিবন্ধ - ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়

সেকালের থিয়েটার ও নটী বিনোদিনী
ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়



পুরুষতান্ত্রিক আমাদের সমাজে সমাজ প্রগতির প্রক্রিয়ায় নারীর অবদানকে যোগ্য স্বীকৃতি কোনদিনই দেয় না । বাংলা থিয়েটারে আদিপর্বে এক বারাঙ্গনা কন্যা তাঁর তন্ময় সাধনায় ও মেধায় সেকালের অভিনয় জগতের সম্রাজ্ঞী হয়ে উঠেছিলেন ও বাংলা থিয়েটারের নির্মাণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গিয়েছিলেন, তার স্বীকৃতিও এই সমাজ দেয় নি । তিনি বিনোদিনী দাসী বা নটী বিনোদিনী ।

অন্যরকম ভাবে বাঁচার তাগিদে পিতৃ-পরিচয়হীনা বিনোদিনী থিয়েটারকেই তাঁর মুক্তিতীর্থ ভেবেছিলেন, প্রবল বঞ্চনা ও ছলনার শিকার হয়ে খ্যাতির শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেও মাত্র ২৩ বছর বয়সে চিরতরে মঞ্চত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন । আশার কথা, তাঁর জন্মের সার্ধশত বর্ষে এই মহীয়সী রমণীকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তাঁর জীবনকাহিনী আমরা জানতে চাইছি ।

১৮৭৪এর শেষের দিক, তখন বাংলা থিয়েটারের নিতান্ত শৈশবকাল । ঠিক দু’বছর আগে, ১৮৭২এর ৭ই ডিসেম্বর সাধারণ রঙ্গালয়ের প্রতিষ্ঠা হয়েছে দীনবন্ধু মিত্রর ‘নীল দর্পন’ নাটক দিয়ে । তার আগে কলকাতার ধনাঢ্য বাবুদের বদান্যতায় জমিদার বাবুদের আঙ্গিনায় সখের থিয়েটার হত মাঝে মধ্যে । কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তখন কলকাতার নতুন বিনোদন থিয়েটার দেখার সুযোগ ছিল না ।

ন্যাশনাল থিয়েটারের প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সাধারণের জন্য থিয়েটারের দরজা উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছিল । কিন্তু নাটকের নারী চরিত্র রূপায়ণ করতেন পুরুষ অভিনেতারাই । ১৮৭৩এ বেঙ্গল থিয়েটার চারজন বারাঙ্গনা কন্যাকে অভিনেত্রী নিয়োগ করেছিলেন। মেয়েদের কাছে নাট্যাভিনয়ের দরজা খুলে গেলো সেই প্রথম, যে কাজের অক্লান্ত সৈনিক ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত ।

মধুসূদনের বেঙ্গল থিয়েটারে নাটক দেওয়ার শর্তই ছিল নারীচরিত্রে অভিনয় মেয়েদের দিয়েই করাতে হবে । ১৮৭৩ সালের ১৬ই অগস্ট মধুসূদনের ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকটি দিয়ে বাংলা নাট্যাভিনয়ে অভিনেত্রী নিয়োগের ধারাবাহিকতার সূচনা হয় । এই যুগান্তকারী ঘটনাটি অবশ্য দেখে যেতে পারেননি মধুসূদন, তার আগেই মৃত্যু হয় বাংলা থিয়েটারে অভিনেত্রী নিয়োগের পক্ষে অক্লান্ত সৈনিক মাইকেল মধুসূদন দত্তর (২৯জুন ১৮৭৩) ।

মেয়েদের জন্য থিয়েটারের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় অন্ধকার জগতের মেয়েরা মর্য্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন পেলেন । তাদের একটা তাগিদ ছিল – মুক্তির তাগিদ । থিয়েটারকে তাই তারা নিজেদের মুক্তিতীর্থ মনে করলেন, থিয়েটারকে ভালোবেসে পবিত্র হতে চাইলেন ।

এই পথ ধরে বিনোদিনীও এলেন থিয়েটারকে ভালোবাসতে । বারো বছরের বালিকা বিনোদিনী দশটাকা মাস-মাইনেতে ভর্তি হয়ে গেলেন গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে, নাট্যশিক্ষক অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফি ।

১৮৭৫এর শুরুতে অর্ধেন্দু শেখর মুস্তাফির পরিচালনায় গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার লক্ষ্ণৌ, লাহোর, দিল্লী প্রভৃতি স্থানে অভিনয় করে নীলদর্পণ, সুরেন্দ্রবিনোদিনী, সতী কি কলঙ্কিনী, গজানন্দ ও যুবরাজ প্রমু্খ ইংরাজ বিরোধী নাটক । বিনোদিনীও সেই দলে ছিলেন ।

তাঁদের নাটকেই ক্ষিপ্ত হয়ে ইংরাজ-শাসন জারি করে কুখ্যাত নাট্যনিয়ন্ত্রণ আইন । গ্রেট ন্যাশনাল বন্ধ হয়ে যায়, বিনোদিনী যোগ দেন বেঙ্গল থিয়েটারে । এখানে বিনোদিনী অভিনয় করলেন ‘মেঘনাদ বধ’ নাটকে প্রমীলা, ‘দুর্গেশ নন্দিনী’’তে আয়েষা, ‘কপাল কুণ্ডলা’ প্রমুখ দুরূহ চরিত্রে । বেঙ্গল থিয়েটারে বিনোদিনী অভিনয় করেছিলেন মাত্র উনিশ মাস আর এই অল্প সময়েই সেকালের সব প্রধান নাট্যকারের নাটকের মুখ্য ভুমিকায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন বিনোদিনী ।

নজরে পড়েন গিরীশচন্দ্র ঘোষের । গিরীশচন্দ্র ঘোষ তাঁকে নিয়ে আসেন নিজ মালিকানাধীন ন্যাশনাল থিয়েটারে । চারবছর পরেই গিরীশচন্দ্রের ন্যাশনাল থিয়েটারের মালিকানা বদল হয় । হীরা জহরতের ব্যবসায়ী মাড়োয়ারি যুবক প্রতাপ চাঁদ জহুরী থিয়েটার ব্যবসায়ে নামেন ও ন্যাশনাল থিয়েটার কিনে নেন ।

গিরীশচন্দ্র চাকুরী ছেড়ে পেশাদার বেতনভোগী ম্যানেজার হন । গিরীশচন্দ্রকে সামনে রেখেই প্রতাপ জহুরীর থিয়েটার ব্যবসায়ে নামা । প্রতাপ জানতেন গিরীশচন্দ্র থাকা মানেই বিনোদিনীর থাকা । কেননা ইতিমধ্যেই বিনোদিনীর অভিনয়ই তখনকার নাট্যজগতের প্রধানতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল ।

বস্তুত, এই সময় থেকে বাংলা থিয়েটার তার শৈশব কাটিয়ে পুরো মাত্রায় পেশাদারী হয়ে ওঠার দিকে পা বাড়িয়েছিল । বিনোদিনীর বারো বছরের অভিনয় জীবনের নয় বছরই কেটেছে গিরীশচন্দ্রের সঙ্গে, অভিনয় করেছেন ৯৬টি নাটকে ।

বিনোদিনীর নিজের কথায় - “তাঁহার শিক্ষায় আমার যৌবনের প্রথম হইতে জীবনের সারভাগ অতিবাহিত হইয়াছে” । অর্থাৎ বাংলা থিয়েটারের উদ্ভব পর্বের শৈশব অবস্থা থেকে পেশাদারী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায় বিনোদিনীর যোগদান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল । বিনোদিনীকে বাদ দিয়ে ১৮৭৪ থেকে ১৮৮৬ এই একযুগের বাংলা থিয়েটারের কোন আলোচনা করা যায় না ।

বিনোদিনীর সামনে অভিনয়ের কোন অনুসরণযোগ্য আদর্শ ছিল না । তাকে শুরু করতে হয়েছে শূণ্য থেকে । দ্বিতীয়ত, সেকালের অভিনেত্রীরা বারাঙ্গনা হওয়ার কারণে পত্র-পত্রিকাগুলিতে তাদের অভিনয়ের আলোচনা কদাচই থাকতো । বিনোদিনীর প্রথম অভিনয় ১৯৭৪এর ১২ই ডিসেম্বর, গিরীশচন্দ্রের ‘শত্রু সংহার’ নাটকে একটি অপ্রধান চরিত্র দ্রৌপদীর সখীর ভূমিকায় । মাত্র চার পাঁচটি সংলাপ । মাত্র তিনমাস পরেই ১৮৭৫এর ৬ই মার্চ ‘হেমলতা’ নাটকের নামভূমিকায় এবং তারপর অভিনয় করেন নীলদর্পণ, লীলাবতী, নবীন তপস্বিনী, সধবার একাদশী, সরোজিনীর মত গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারের মঞ্চসফল নাটকগুলিতে ১৮৭৬এর ফেব্রুয়ারির মধ্যে ।

অতএব আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, অভিনয় দক্ষতার জন্যই মাত্র একবছরের মধ্যে নাটকের ক্ষেত্রে বিনোদিনী কত অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন ।

বিনোদিনী তাঁর ১২বছরের নাট্যজীবনে চারটি মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন – গ্রেট ন্যাশনাল’ ‘বেঙ্গল থিয়েটার’, ‘ন্যাশনাল থিয়েটার’ ও ‘স্টার থিয়েটার’। নাট্য শিক্ষক পেয়েছিলেন অর্ধেন্দুশেখর মুস্তাফি(গ্রেট ন্যাশানাল), শরৎচন্দ্র ঘোষ (বেঙ্গল) এবং গিরীশচন্দ্র ঘোষ (ন্যাশনাল ও স্টার থিয়েটার) । বেঙ্গল থিয়েটারে দু’বছর থাকা কালীন বিনোদিনী যথার্থ পরিণত হয়ে উঠেছিলেন । বঙ্কিমচন্দ্রের মৃণালিনীতে ‘মনোরমা’, ‘কপাল কুন্ডলা’, দূর্গেশ নন্দিনীর ‘আয়েষা’ ও ‘তিলোত্তমা’, মেঘনাদ বধ’এ ‘প্রমীলা’র মত জটিল চরিত্রের অভিনয়ে অসামান্য দক্ষতা দেখিয়েছিলেন । মৃণালিনীতে ‘মনোরমা’র জটিল চরিত্রটিকে বিনোদিনী কেমন বিশ্লেষণ করেছিলেন, সেকথা আত্মকথায় লিখে গেছেন, “একসঙ্গে বালিকা, প্রেমময়ী যুবতী, পরামর্শদাতা, মন্ত্রী, অবশেষে পরম পবিত্র চিত্তে স্বামী সহ-মরণ অভিলাষিণী দৃঢ়চেতা এক রমণী”। বিনোদিনী তখন ১৪বছরের বালিকা । এমন বিশ্লেষণই বলে দেয় তাঁর অভিনয় প্রতিভার গভীরতা ।

স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্র মৃণালিনীর অভিনয় দেখে মন্তব্য করেছিলেন, “আমি মনোরমার চিত্র পুস্তকেই লিখিয়াছিলাম, কখনো যে প্রত্যক্ষ করিব এমন আশা করি নাই । আজ বিনোদের অভিনয় দেখিয়া সে ভ্রম ঘুচিল”।

এহেন বাংলা থিয়েটার বিনোদিনীকে মনে রাখেনি । বিনোদিনীকে পাওয়ার লোভে গুর্মুখ রায় মুসাদ্দি নামে এক মাড়োয়ারি যুবক থিয়েটারের ব্যবসায়ে নামেন । তিনি একটি থিয়েটার বাড়ি নির্মাণ করে দেবেন, কিন্তু গিরীশচন্দ্রদের শর্ত দিলেন বিনোদিনীকে তাঁর রক্ষিতা হয়ে থাকার জন্য রাজি করাতে হবে, আর থিয়েটার হবে বিনোদিনীর নামে । নিজেদের থিয়েটার হবে, শিল্পীদের থিয়েটার হবে তাঁর নামে, এই প্রতিশ্রুতিতে বিনোদিনী সম্মত হয়েছিলেন গিরীশচন্দ্রদের প্রস্তাবে । নানা গন্ডগোলের কারণে গুর্মুখ রায় থিয়েটার বাড়ির বদলে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন বিনোদিনীকে ।

বিনোদিনী নগদ পঞ্চাশ হাজার টাকার লোভ হেলায় ত্যাগ করেছিলেন । বলেছিলেন থিয়েটার বাড়ি না হলে তিনি গুর্মুখের সঙ্গিনী হবেন না । দেড়শ’ বছর আগে পঞ্চাশ হাজার টাকার লোভ হেলায় ত্যাগ করেছিলেন যিনি, তাঁকে প্রতারিত হতে হ’ল তাঁর সহ অভিনেতা নাট্যরথীদের কাছ থেকে । বাংলা পেশাদারী থিয়েটারের উদ্ভব কালের সে এক ক্লেদাক্ত ঘটনা ।

বিনোদিনী তাঁর আত্মকথায় লিখে গিয়েছেন, “শীঘ্র শীঘ্র প্রস্তুতের জন্য রাত্র পর্যন্ত কার্য হইত । সকলে চলিয়া যাইতেন । আমি, গুর্মুখ বাবু আর দু’একজন রাত্রি জাগিয়া কার্য করাইয়া লইতাম” । থিয়েটার বাড়ি হল, কিন্তু গুর্মুখ রায় বা বিনোদিনীর অজান্তে গিরীশবাবুরা সেই থিয়েটারের রেজিস্ট্রী করে নিলেন বিনোদিনী থিয়েটার নয়, ‘স্টার থিয়েটার’ নামে ।

বিনোদিনী তাঁর আত্মকথায় লিখে গিয়েছেন, “আমি তখন একেবারে উহাদের হাতের ভিতর! আর আমি স্বপ্নেও ভাবি নাই যে, উহারা ছলনা দ্বারা আমার সহিত এমনভাবে অসৎ ব্যবহার করিবেন” ।

এই প্রবঞ্চনা সত্বেও থিয়েটারের প্রতি তাঁর ভালোবাসার জন্য বিনোদিনী স্টার থিয়েটারেই থেকে গিয়েছিলেন । ১৮৮৩র ২১শে জুলাই স্টার থিয়েটারের উদ্বোধন হয় গিরীশচন্দ্রের ‘দক্ষযজ্ঞ’ নাটক দিয়ে, সতীর ভুমিকায় বিনোদিনী ।

মাত্র ছয়মাস পরেই অসুস্থতা ও পারিবারিক চাপে গুর্মুখ থিয়েটার ব্যবসা ত্যাগ করেন । গুর্মুখ চেয়েছিলেন যার জন্য তিনি থিয়েটার বানিয়েছিলেন সেই বিনোদিনীকে থিয়েটারের স্বত্ব দিয়ে যেতে । এবারেও গিরীশ বাবুরা বাধা দিলেন । সরলমতী থিয়েটারে নিবেদিতপ্রাণা বিনোদিনী আবারও বঞ্চিত হলেন ।

মাত্র এগারো হাজার টাকায় স্টার থিয়েটার কিনে নিয়েছিলেন অমৃতলাল মিত্র, দাশুচরণ নিয়োগীরা ।

কেন এই প্রতারণা ? সেকালের নাট্যরথীরা বলেছিলেন, এক বারাঙ্গনা কন্যার নামে থিয়েটার সে যুগের সমাজ মেনে নিত না, থিয়েটার চলতো না ।

অথচ এই বারাঙ্গনা কন্যার অভিনয়ই সেদিন বাংলা থিয়েটারকে মর্যাদামন্ডিত করেছিল । ১৮৮৪’র ২রা অগস্ট গিরীশচন্দ্রের ‘চৈতন্য লীলা’য় নিমাই চরিত্রে বিনোদিনীর অভিনয় দেখে শ্রীরামকৃষ্ণ দেব ভাববিহ্বল হয়ে পড়েন, বিনোদিনীর মস্তক স্পর্শ করে আশির্বাদ করেন । থিয়েটারে অশুচিতার বেড়া ভেঙ্গে যায় । ১৮৮৬র ১৬ই অগস্ট রামকৃষ্ণ দেবের মৃত্যু, আর তার চারমাস পরেই একরাশ ক্ষোভ ও যন্ত্রণা নিয়ে অভিনয় খ্যাতির শীর্ষবিন্দু স্পর্শ করেও ১৮৮৭র ১লা জানুয়ারী থিয়েটার ত্যাগ করেন মাত্র ২৩ বছর বয়সে । আর ফিরে আসেন নি ।

মঞ্চ ত্যাগের পর আরো পঞ্চান্ন বছর বেঁচে ছিলেন বিনোদিনী । বৃদ্ধ বয়সেও স্টারে থিয়েটার দেখতে আসতেন । গিরীশবাবুরা তাকে মঞ্চে ফিরিয়ে আনার কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেন নি ।

সেকালের সব অভিনেত্রীই আসতেন বারাঙ্গনা পল্লী থেকে, যাঁরা সকলেই বাংলা থিয়েটারের নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গিয়েছেন, বাংলা থিয়েটারকে মর্যাদামন্ডিত করেছেন, তাঁদের প্রাপ্য মর্যাদাটুকুও এই সমাজ দেয় নি । গিরীশচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর মৃতদেহে মালা দেবার অধিকারটুকুও তাদের দেওয়া হয়নি । বিনোদিনীর কন্যা সন্তানকেও সমাজপতিরা বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে বাধা দিয়েছিলেন, বিনোদিনী পারেননি তার কন্যা শকুন্তলাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে । থিয়েটারের প্রথম অভিনেত্রী গোলাপ সুন্দরী বা স্বনামে সুকুমারী দত্ত দেশের প্রথম মহিলা নাট্যকারের সম্মান অর্জন করেছিলেন, গিরীশ-যুগের অভিনেত্রী কৃষ্ণভামিনী তাঁর অর্জিত সম্পত্তি দান করেছিলেন শিক্ষা বিস্তারের কাজে । আবার গিরীশ-যুগ থেকে শিশির-যুগের অভিনেত্রী কুসুম কুমারী বৃদ্ধা বয়সে রংমহল থিয়েটারের প্রবেশ পথে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করতেন ।

৭৯ বছর বয়সে ১৯৪১এর ১২ই ফেব্রুয়ারি জন্মস্থান ১৪৫নম্বর কর্নওয়ালিশ ষ্ট্রীটের বাসায় নিভৃতে তাঁর মৃত্যুকালে বাঙ্গালির সমাজ অনেক উদার, তবুও কিন্তু অন্ধকার জগত থেকে উঠে আসা , আমাদের থিয়েটারের নির্মাণে অসামান্য অবদান রেখে যাওয়া এক নটীর মৃত্যুতে কোন শোকসভা হয়নি ।

কোন সংবাদপত্রে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল কি না জানা নেই । তাঁর একটি কবিতার পংক্তিতে “স্মৃতি হ’তে বিস্মৃতিতেই অধিক সন্তোষ” মনে করেছিলেন বিনোদিনী । দেড়শ বছর পর আমরা কিন্তু ইতিহাসের সেই ছিন্নপত্র সন্ধান করে বেদনাহত হয়ে যাই ।