তর্ক-বিতর্ক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
তর্ক-বিতর্ক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

চিলেকোঠা সরগরম

এই সংখ্যার বিষয়ঃ
"মেয়েদের অতি আধুনিক বস্ত্র-অল্পতা সাম্প্রতিক কালের নারী নির্যাতনের অন্যতম প্রধান একটি কারণ"

(বিশেষ সূচনাঃ এই বিভাগে প্রকাশিত প্রতিটি মন্তব্য অংশগ্রহণকারীর একান্তই নিজস্ব মতামত, এ বিষয়ে চিলেকোঠা অয়েবজিন কোনোভাবে দায়ী নয়)



পক্ষেঃ

১) সুস্মিতা সিং

মাননীয় বিচারক মণ্ডলী ও সভার বিপক্ষের বন্ধুরাঃ

সভার মতে, " মেয়েদের অতি আধুনিক বস্ত্র-অল্পতা সাম্প্রতিক কালের নারী নির্যাতনের অন্যতম প্রধান একটি কারণ " – এখানে দুটি শব্দবন্ধ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে প্রথমটি হোল ‘নারী নির্যাতন’ । নির্যাতন শব্দটিকে কাটাছেঁড়া করলে একদিকে যেমন Rape, Molestation, Eve Teasing, Physical Assault, ইত্যাদি পড়ে, অন্যদিকে মানসিক নির্যাতনটিকেও কিন্তু উপেক্ষা করা উচিত নয়। আর দ্বিতীয়টি হোল ‘অন্যতম প্রধান একটি কারণ’ – অর্থাৎ নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে খোলামেলা পোশাক পরিধানকে একমাত্র কারণ বলে মনে না করে সভা এটিকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলির একটি বলে মনে করছে। আমি সভার এই মতকে সম্পূর্ণ সমর্থন করি।

যে দেশের সাম্প্রতিক অতীতের একেবারে প্রথম সারির একদল কবিসাহিত্যিক কলকাতা থেকে সুদূর সাঁওতাল পরগনায় দৌড়ান, ‘মাথার প’রে দেয়নি তুলে বাস’ ও ‘মুক্তবেণী পিঠের প’রে লোটে’ বলে সুঢৌল শরীরের অধিকারিণী সাঁওতাল রমণীরা সহজলোভ্যা ভেবে এবং অবশেষে সাঁওতাল পুরুষদের তাড়া খেয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচিয়ে কোনোরকমে ফিরে আসেন নিজের ডেরায়, সেই দেশের মানুষের কোনোরকম Hypocrisy সাজে না।

যে দেশে মেয়েদের চায়ের ভাঁড়ের সঙ্গে তুলনা করে ‘খাওয়া’র পর ছুঁড়ে ফেলে দেওয়ার উপমা টানা হয়, সে দেশে Tatoo আঁকা খোলা পিঠ বা Clean n Clear বাহুমূল, অথবা মাত্র এক-চতুর্থাংশ আবৃত রোম-বিসর্জিত চিক্কণ Chicken Legs, কিম্বা Deep n Dark Cleavage আর Piercing করা গভীর উন্মুক্ত নাভিদেশ দেখলে অবশ্যই অধিকাংশ পুরুষেরই সংযমে টান পড়ে বৈকি।

সব পুরুষই তো আর নারী নির্যাতনকারী হন না; কিন্তু যাঁরা হন, তাঁদের চিত্তবিকৃতিতে নারীর খোলামেলা পোশাক নিশিতরূপে ইন্ধন জোগায়। অবশ্যই তা উপযুক্ত শিক্ষা ও পরিমার্জিত মননশীলতার অভাবে, এই নিয়ে বিতর্কের কোন অবকাশই নেই।

আসলে যে সমস্যাটিকে চিনলে আমাদের আস্তিনে দাগ পড়তে পারে, সেটিকে না চেনার জন্য আমরা সযত্নে অন্তত একশোটা কুযুক্তি খাঁড়া করি। আবারও বলছি, সভা জানতে চায়, খোলামেলা পোশাক নারী নির্যাতনের অনেক কারণগুলির মধ্যে একটি কারণ কিনা। আমার মতে অবশ্যই এটি একটি কারণ। আগে সমস্যাটি ঠিকমতো চিহ্নিত করে স্বীকার করতে হবে। সেখানে ভাবের ঘরে চুরি করে লাভ নেই। তারপর না হয় ঠিক করা যাবে, মেয়েরা বোরখা পরবে, না ছেলেদের মানসিক চিকিৎসা ও নীতি শিক্ষার ইঞ্জেক্‌শান দেওয়া হবে!।




বিপক্ষেঃ


১) রুমনি সেন

এখানে নারী নির্যাতন বলতে নিশ্চয়ই রেপ ও মলেস্টেশন বোঝানো হচ্ছে। বস্ত্রস্বল্পতার কারণে রেপ ও মলেস্টেশন হচ্ছে এটা অযৌক্তিক কথা।

আমরা দেখি চকোলেট বা ক্যান্ডিতে মোড়ক থাকে, তা না হলে মাছি বা পিঁপড়ে ধরতে পারে। মোড়কটা থাকলে মাছি বা পিঁপড়ে ভাবে ওটা তাদের খাদ্য নয় তাই আর ধারে কাছে আসে না।

কিন্তু মানুষরা এত বোকা নয়। মেয়েরা নিজেদের আপাদমস্তক কাপড়ে মুড়ে রাখলেও তারা বোঝে পোষাকের আড়ালে একটা দেহ আছে। আর পোষাকটা এমন কোন বর্ম নয় যে তার দ্বারা অপরাধীরদের নিরস্ত বা পরাস্ত করা যাবে। বরং খুব বেশি পোষাকে আবৃত মহিলারাই আক্রান্ত হলে প্রতিরোধ করতে পারবে না, পোষাকের কারণেই। একবার একটি মেয়ে বলেছিল, জিনস পরা থাকলে আক্রমণকারীকে লাথি মারতে সুবিধে হয়।

এমন কোন পরিসংখ্যান নেই যে বিকিনি পরা মেয়েরাই বেশি রেপড হয়। স্কুল কলেজের ছাত্রী থেকে শুরু করে কর্মরতা মহিলা, সর্বস্তরেই রেপ হচ্ছে। এরা কেউ মিনিস্কার্ট পরে চলাফেরা করে না। আর যদি চলাফেরা করেও থাকে সে জন্য তাকে রেপ করার অধিকার জন্মায় না। শিশুরা (স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে) রেপিস্টদের সহজ শিকার। এমন কি গৃহপালিত পশুরাও। এদের ক্ষেত্রেও কি মিনিস্কার্ট তত্ত্ব খাটে? আসলে এই সব অপরাধের জন্য দায়ী হল পুরুষের অসুস্থ মানসিকতা, তৎসহ মদ ড্রাগ, পর্ন ভিডিও ইত্যাদিও রয়েছে আগুনে হাওয়া দিতে এবং সর্বোপরি রয়েছে দুর্বল প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা, যা অপরাধীর মনে কিছু মাত্র ভীতিসঞ্চার করে না।

সমস্যাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে হবে, তাহলেই সমাধানের পথ বেরিয়ে আসবে। তা না করে ভিকটিম ব্লেমিং করলে সমস্যাটা থেকেই যাবে, শুধু তাই নয়, দিন দিন বাড়তেও থাকবে।



২) অরুণ চট্টোপাধ্যায়


অলক্তরাঙ্গা পায়ে, সিন্দুর-শোভিতা ভালে, শাড়ী পরিহিতা অঞ্চলে অবগুন্ঠিতা নারী – এক কালে নারীর এই বধূরূপ ও মাতৃরূপ ছিল বাঙ্গালী তথা ভারতীয় সমাজের নারীর প্রিয় ভূষণ । সেই কালের হয়ত কথা বলছি, যখন নারীরা সংসারে আবদ্ধ ছিলেন স্বামীর বাহুডোরে, রন্ধন-কর্মে ও শিশু-পালনে । স্বামী, সংসার ও সন্তান এই তিন স-এর সু-পালিকা ছিলেন তিনি । পিতৃ-তান্ত্রিক সমাজের ধারা অনুযায়ী স্বামী-শ্বশুরের বা সমাজের তথাকথিত অভিভাবক বা সমাজপতিদের বাঁধাছকের পোশাক তাঁরা হয়ত মানিয়ে নিয়েছিলেন খানিকটা বাধ্য হয়ে ।

ইংরেজ শাসনাধীন থাকা কালে পুরুষরা কাজের সুবিধার জন্যই হোক বা অনুকরণ-প্রিয়তার জন্যই হোক ইংরেজদের পোশাক ধারণ করেছিলেন । কিন্তু অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার পায় নি সে পোশাক । আজ ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কোনও ফারাক নেই। প্রত্যেকেই স্বীকৃত একজন মানুষ হিসেবে । প্রত্যেককেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে আপন আপন কর্তব্যপালনে দায়বদ্ধ । কাজের সুবিধার জন্যও মেয়েদের কিছু সুবিধাজনক পোশাক যেমন চুড়িদার, জিনস- টপ ইত্যাদি বা পুলিশ, নার্স, মিলিটারি ইত্যাদি ক্ষেত্রে তাদের নিজ নিজ বিভাগীয় ইউনিফর্ম পরতে হয় ।

এটা ছাড়াও রয়েছে অভিনয়, মডেলিং ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রয়োজনানুসারে পরিচালকের পরামর্শ মত পোশাক পরিধান স্বীকৃত । এই শেষোক্ত ক্ষেত্রগুলিতে অবশ্য পোশাকের মাপকাঠি বলতে বর্তমানে আছে শুধুই তার হ্রস্বতা । টি-আর-পি বা বক্স-অফিসের সাফল্যের খাতিরে এই হ্রস্বতা যেন ক্রমেই বেড়ে চলেছে ।

এ কথা ঠিক যে, আজ নারীদের মধ্যে পোশাক-হ্রস্বতার প্রতিযোগিতা লেগে গেছে । আর এই প্রতিযোগিতার ফলশ্রুতি উপহার দিচ্ছে নানান অশালীনতাও । এমন কি বাচ্চা মেয়েদেরও ফ্যাশানের খাতিরে যেগুলো পরানো হচ্ছে সেগুলো রুচির সীমাও হয়ত অতিক্রম করে যায় । উঠতি মেয়েদের শরীরের রেখাগুলি অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে পুরুষের, বিশেষভাবে উঠতি বয়সের পুরুষের কাছে । তারা নারীর সৌন্দর্যের আড়ালে উপভোগ করে যৌন-উন্মাদনা আর উত্তেজনা ।

নারীর এই অশালীন পোশাক নিন্দনীয় হতে পারে, সেটা পুরুষের চোখে জ্বালাতে পারে কামের আগুন । কিন্তু তা নারী- নির্যাতনের কারণ কেন হবে সেটা সুবোধ্য নয় । তাহলে তো এই নিগ্রহ অনেক অনেক বেড়ে যাওয়ার কথা । মনে রাখতে হবে পশুরা কিন্তু কোনও পোশাকই পরে না । তবু পশুরা তাদের একটি নির্দিষ্ট সময় ছাড়া কাম-পীড়িত হয় না । তবে কি মানুষের অবস্থান পশুর নীচে নেমে গেছে ? নারী-নিগ্রহ সম্পূর্ণ একটি ভিন্ন বিষয় । এটি নির্ভর করে পুরুষের সামগ্রিকতার মধ্যে নয় বরং কিছু বিকৃত-কাম পুরুষের বিকৃত দৃষ্টি আর পরিণতি-বোধের অভাবের জন্যই । যৌন-আবেদনকারী পোশাকে কাম-পীড়িত হওয়া আর নারী- নির্যাতন সম্পূর্ণ দুই ভিন্ন মানসিকতার বিষয় । একের সঙ্গে অন্যকে গুলিয়ে ফেলা এক ধরণের সরলীকরণ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয় । নারীর পোশাক অবশ্যই রুচিশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়, তবে এই বিকৃত-কাম পুরুষগুলির মানসিকতার সু-পরামর্শ বা কাউন্সেলিং খুব জরুরী ।



৩) স্বপন দেব

“কার্যেষু দাসী, করণেষু মন্ত্রী, ভোজেষু মাতা, শয়নেষু রম্ভা, রুপেষু লক্ষ্মী, ক্ষমায়েষু ধরিত্রী, সৎ ধর্মযুক্তা, কুলধর্ম পত্নী”

যে সমাজের নীতিশাস্ত্র নারীকে দিনে দাসী আর রাতে সেবাদাসী হওয়ার বিধান দেয়, সেই সমাজে নারী নির্যাতনের দায় যে একান্তভাবেই নির্যাতিতার ওপর বর্তাবে তাতে আশ্চর্যের কোন কারণ নেই। বক্তব্য রাখার আগে আমার প্রশ্ন হল, এখানে নির্যাতন বলতে কোন নির্যাতনের কথা বলা হচ্ছে ? শারীরিক, মানসিক নাকি, যৌন-নির্যাতন ? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নি, এখানে নির্যাতন বলতে শুধুমাত্র যৌননির্যাতন বোঝানো হচ্ছে, তাহলে সাম্প্রতিককালের কয়েকটি দৃষ্টান্তঃ- দিল্লী গণধর্ষণ, বারাসাত গণধর্ষণ, গৌহাটি গণযৌননির্যাতন, মুম্বাই জার্নালিস্ট গণধর্ষন, চেন্নাই মেডিক্যাল ছাত্রী গণধর্ষণ এর কোনোটাতেই কিন্তু চেষ্টা করেও আধুনিক বস্ত্রাল্পতা কে নারী নির্যাতনের কারণ দর্শানো যায়নি……। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নি যে, স্বল্পবস্ত্র পরিহিতা নারীকে পণ্য হিসাবে দেখা হয়, তাহলেও প্রশ্ন ওঠে, পণ্যকেও কি তার বিনিময় মূল্য ছাড়া ভোগ করা যায় ? বাজারে আলু, পটল পেঁয়াজ, পেট্রলের দাম বাড়ে, কিন্তু নারী নামক পণ্যের কোন মূল্যবৃদ্ধি হয়না ! তাই নারীর ওপর নির্যাতন হলে, নারীকে পণ্য বানিয়ে তার আধুনিকতার ওপর দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে কোন সামাজিক অপরাধের জন্যই পুরুষকে দোষারোপ করা হয়না। পুরুষজাতি মহান। তারা অন্যের স্ত্রীর সাথে নিষিদ্ধ প্রেম করেও যুগে যুগে পূজিত হন মহান প্রেমিক রূপে, কলঙ্কিনী হন শুধু রাধা রা !! অপহৃত হওয়ার অপরাধে অগ্নিপরীক্ষা দেন সীতা। রাম পূজিত হন যুগশ্রেষ্ঠ স্বামী রূপে! স্ত্রীকে পণ রেখে জুয়া খেলে প্রকাশ্য রাজসভায় স্ত্রীর যৌননির্যাতনের নির্বাক সাক্ষী হয়েও ধর্মেরধ্বজা ওড়ান ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির! ভারতবর্ষের হাজার হাজার গ্রামের লক্ষ লক্ষ মহিলা প্রতিদিন, প্রতি রাতে নির্যাতিতা, ধর্ষিতা হচ্ছেন যাঁরা খবরের কাগজের হেডলাইনে আসেন না। তারা কিন্তু কেউ মিনি স্কার্ট পরে ঘুরে বেড়ান না। ভারতীয় সমাজব্যবস্থায় নারীনির্যাতন এক চিরকালীন প্রশ্ন-চিহ্ন। নারী সব নির্যাতন......সব যন্ত্রণা মুখ বুজে সহ্য করে যাবে—পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এটাই দাবী। আধুনিক নারী যদি তার প্রতিবাদ করে, তবে নির্যাতনের অপরাধে নির্যাতনকারী নয়, নির্যাতিতার আধুনিকতাকেই দায়ী করার এই জঘন্য চক্রান্তে, আধুনিকার স্বল্প-বস্ত্রতা নয়, বরং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কুৎসিত নগ্নতাই প্রকট হয়।



৪) অনুপম দাশশর্মা।

সকালে কাগজ খুললেই আতঙ্কে শিরশির করে শরীর। আবার দেখব নাতো তিনবছরের কোন শিশুকন্যার ধর্ষনের খবর! শুধু এইটুকুই বুঝিয়ে দেয় সমাজের নরকজাত মানুষগুলো যখন ধর্ষকামী ইচ্ছার বলিকাঠে একটি শিশুকে চড়াতেও একচুল সরে আসতে পারেনা। তাদের কাছে জঘন্য লালসাই প্রধান উৎসেচক। ওই শিশুটির ক্ষেত্রে পোষাকের কোন তাৎপর্য থাকে না। পথেঘাটে প্রবল পশ্চিমী আবহাওয়ায় নিশ্চই কিছু যৌন ক্ষুধায় সুড়সুড়ি দেয় কিন্তু নারী নির্যাতনের একমাত্র কারণ ওই আপাত উদ্দেশ্যমূলক পোষাক হতে পারে না।

কালের বয়স বাড়ার সাথে সাথে সংস্কৃতির চরিত্র পালটে যায়, পালটে যায় মানুষের ভাললাগার রসদ। ক্ষুরধার আকর্ষণের সীমা লঙ্ঘন করে বিজ্ঞাপনের নারী শরীরের অপব্যবহারের বিপনন।

যে শিশু দীপাবলিতে তারাবাতি জ্বালায় সে ঘুরেও তাকায়না তারাবাতির প্যাকেটে অর্ধ নগ্ন নারী শরীরের ছবিটির দিকে। অথচ সুক্ষ্মভাবে পণ্যকে গণিকাবৃত্তিতে নামিয়ে এনে নারী অবমাননা করেই চলেছে দিনরাত অসাধু চরিত্ররা। শিল্পের বকলমে রিপুর তাড়না দমিত হয়, কখনও কবিতায় কখনও বিদেশী নাটকের চরিত্রায়নে।

এ সবই একটা দুষ্ট শ্রেণীকে উৎসাহিত করে নোংরা কাজে, নারীর অবমাননায়। সুতরাং কিছু অসংলগ্ন পোষাক পরিহিতা কখনই একক দায়ী হতে পারে না।

চিলেকোঠা সরগরম

এই সংখ্যার বিষয়ঃ
VIRTUAL RELATION-এ আবেগ আছে, স্থায়িত্ব নেই


[ এই বিতর্ক বিভাগের সমস্ত মতামত সম্পূর্ণ ভাবে অংশগ্রহণকারীদের নিজস্ব, তা চিলেকোঠা ওয়েবজিনের মতামত নয় ]


পক্ষেঃ

১. শ্রীরূপা চ্যাটার্জী

VIRTUAL RELATION এ আবেগ আছে স্থায়িত্ব নেই ' আমি সম্পূর্ণ ভাবে এই মতটির পক্ষে। VIRTUALজগতে আমরা যখন এক জনের সাথে আলাপ করি, তখন আমরা জানতেই পারিনা সেই মানুষটা আসলে কেমন, কী করে, এমনকি সে নারী না পুরুষ এবং তাঁর সঠিক বয়স, সঠিক পরিচয়ও আমরা জানতে পারিনা, শুধুমাত্র তাঁর কথার উপর বিশ্বাস করে আবেগে ভেসে গিয়ে আমরা একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করি, অনেক সময়ই দেখা যায় একটা মিথ্যার উপর নির্ভর করে একটা নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি করতে গিয়ে আমরা আমাদের জগত সংসার ভুলে, এমনকি পাশের বাড়ির বন্ধুকে ভুলে, সেই virtual জগতের বন্ধুর কথাই ভাবতে থাকি। তারপর যখন কোনভাবে আসল সত্যিটা সামনে চলে আসে, তখন শুধুই কষ্ট পেতে হয়। আবেগে ভেসে গিয়ে আমরা তার বিনিময়ে শুধু চোখের জলই পেয়ে থাকি। তাই এই বন্ধুত্বে স্থায়িত্ব থাকেনা। যতক্ষণ না আমারা তার সামনে মুখোমুখি হচ্ছি, তার সাথে নিজের মত বিনিময় করছি, ততক্ষণ আমরা জানতেই পারিনা আসল মানুষটাকে। তাই বন্ধুত্বে স্থায়িত্ব পেতে গেলে মানুষটার সাথে সামনাসামনি পরিচয়টা খুব জরুরি। আর সেই জন্যই বোধহয় আমরা virtual বন্ধুদের সাথেও বাস্তবে দেখা করি, তাদের সাথে নিজেদের সুখ দুঃখও আদান প্রদান করি, সম্পর্কটাকে একটা স্থায়িত্ব দিতে চাই।





২. বৃষ্টি ব্যানার্জী

মাননীয় বিচারকমণ্ডলী ও বিপক্ষের বন্ধুরা,

Virtual Relation-এ আবেগ আছে, স্থায়িত্ব নেই, এই মত আমি সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করি। Motion-এর দুটি ভাগ – Virtual Relation-এ আবেগ ও স্থায়িত্ব। প্রথমে আবেগের কথা ধরা যাক। প্রকাশ যেমনই হোক, মানুষ মাত্রেই আবেগ থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেকটা মানুষ আজ সামনের দিকে উর্দ্ধশ্বাসে ছুটছে। নিজের সঙ্গে কথা বলার সময়ও এখন অপ্রতুল। ছুট্‌-ছুট্‌-ছুট্‌ -- সঙ্গী শুধু নিজের passion আর খানিকটা আবেগ, এক মুহূর্তও দাঁড়াবার সময় নেই। আর ঠিক এখানেই আসে স্থায়িত্বের প্রসঙ্গ।

চলমান এই শতাব্দীতে এসে তো স্বায়িত্ব শব্দটার Definition-ই বদলে গেছে। স্থায়িত্ব বলতে আমাদের আগের Generation-এর মানুষজন যা বোঝেন, আমাদের কাছে তার অন্য মানে। কারুর সঙ্গে ছ’মাস Relation থাকলেই মনে হয় সে অনেক দিনের চেনা। আসলে কোনো কিছু নিয়ে অনেকক্ষণ বা অনেকদিন ধরে ভাবার সময়ই আমাদের আর নেই।

ভারতে Virtual Relation সংক্রান্ত সমস্যার ইতিহাস বড়োজোর ৪/৫ বছরের পুরনো। তাই বিষয়টি যদি আমাদের আগের Generation-এর দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে বিশ্লেষণ করি, তাহলে তো মাত্র ৪/৫ বছরের Relation Finally Stability পাবে কিনা, সেটা বিচারেরই সময় এখনও আসে নি, তাই না?

Virtual World আমাদের রুদ্ধশ্বাস দৈনন্দিন জীবনে মুক্তির জানালা। মুহূর্তে পৃথিবী আমার ১৫ ইঞ্চি screenবন্দী। নিভৃত অবসরে আবেগ তাড়িত হয়ে বিভিন্ন রকম Relation-এ জড়িয়ে পড়ি আমরা। বেশীরভাগ সময়ই মোহভঙ্গ হয়, কষ্ট পাই। কিন্তু তবুও সত্যটাকে মর্মে মর্মে জানি বলেই মেনে নিই অত্যন্ত সহজে। দুদিনের মনখারাপ, কিন্তু সেটা নিয়ে বসে থাকার সময় কোথায়? তাই আবার এগিয়ে চলা, চলতে চলতে আবার কারোর সঙ্গে দেখা হওয়া, কিছু ভালো মুহূর্ত তার সঙ্গে share করা। মনে মনে কিন্তু তৈরী থাকা, স্বীকার করি বা না করি। আসলে, ভালো মন্দ যাহাই আসুক সত্যরে লও সহজে, আমরা মেনে নিয়েছি।

Virtual Relation আমাদের Practical Life-এ Secondary Choice। Virtual World-এ শুরু হওয়া Relation তখনই Stability পায়, যখন সেটা Real Life-এ Introduced হয়। আর তখন Relationটা আর Virtual থাকেই না। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে, But exception proves the rule only, তাই না? So, Virtual Relation আর Stability একসঙ্গে যায়ই না, এই নিয়ে কোনও তর্কই নেই।



৩. শ্রীশুভ্র


ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কে আবেগ তো থাকবেই! কারণ আবেগের সূত্রেই আমরা অপরিচয়ের গণ্ডী পেরিয়ে পরস্পরের কাছে এসে পৌঁছোই! সে কাছে আসা শারীরীক নৈকট্যের প্রচলিত ধারণার দূরবর্তী হলেও মন মানসিকতা মমতায় হৃদয়বৃত্তির নিকটবর্তী হতে তো বাধা নেই কোনো! কিন্তু তাই বলে ভারচ্যুয়াল সম্পর্ক থেকে স্থায়িত্ব আশা করাটা অনেকটাই সোনার পাথরবাটির মতোই কষ্টকল্পনা ছাড়া আর কি হতে পারে? সবচেয়ে বড়ো কথা যে সামাজিক অন্তর্জাল ব্যবস্থাকে মাধ্যম করে এই ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের গ্রন্থনা, সেটি কিন্তু বিজ্ঞানের নবীনতম আবিষ্কার! যার বয়স এক দশকের বেশী নয়! তাহলেই বোঝা যায়, এই ব্যবস্থার দৌলতে গড়ে ওঠা সম্পর্কগুলির এখনও শৈশব দশাই ঘোচেনি! তাই না!

তাহলেই দেখা যাচ্ছে মাত্র দশ বছরের সময়সীমায় গড়ে ওঠা এই যে ভার্চ্যুয়াল জগতের সম্পর্কের বিন্যাস, তাতেই স্থায়ীত্বের সীমানা নির্ধারণ করা অনেকটাই গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল গোছের! এদিকে ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের আবেগ নিয়ে যারা স্থায়ীত্বের সুখস্বপ্নে বিভোর, অচিরেই জীবন বাস্তবতার কঠিন ভূমিতে আছাড় খেয়ে তাদের স্বপ্নভগ্নের অভিজ্ঞতায়, ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের আবেগের ক্ষণস্থায়ীত্ব তাঁদের উপলব্ধিতে ধরা পড়ে! এটাই ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের বৈশিষ্ট! আবেগ আসে ঢেউয়ের মতো! যত দ্রুত তার উত্থান ততধিক দ্রুতই তার পতন! এটাই স্বাভাবিক! একটা সম্পর্কের স্থায়ীত্ব নির্ভর করে যে যে বিষয়গুলির উপর, ভার্চুয়্যাল জগতের অলিন্দে সেগুলি কোথায়?

যে কোনো সম্পর্কের স্থায়ীত্বে পারস্পরিক দায়িত্ব কর্তব্য মায়া মমতার যে ভূমিকা থাকে, ভার্চ্যুয়াল সম্পর্কের আলগা পরিসরে সেইগুলির অভাবই এই সম্পর্কের স্থায়ীত্বের পক্ষে প্রধানতম অন্তরায়! যে সম্পর্ক মাউসের একটা দুটো ক্লিকেই আনফ্রণ্ড থেকে ব্লকের সলিল সমাধিতে সমাধিস্ত করা যায়, সে সম্পর্কের ভবিষ্যত নিয়ে আর যাই হোক স্থায়ীত্বের গর্ব করা যায় না! তাই আবেগের আতিশয্যকেই যারা স্থায়ীত্বের নিশ্চয়তা বলে পরামানন্দে বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তাদের প্রজ্ঞা সম্বন্ধে যথেষ্ঠই সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়! তাই বন্ধু, আবেগের ছোঁয়ায় ভার্চ্যুয়াল সম্পর্ক উপভোগ করুন; কিন্তু স্থায়ীত্বের কুহক মায়ায় নিজেকে প্রলোভিত করে ঠকাবেন না!


৪. নারায়ণ রায়

সেদিন পটাইবাবুর সাথে দেখা, মুখ দেখে মনে হ’ল বেশ দুঃশ্চিন্তার মধ্যে আছেন। পটাইবাবুর মুখখানি এমন রোদে পোড়া আমসির মত কেন, একথা শুধাতেই পটাইবাবু বললেন, “আর বলবেন না, ক’দিন ধরে মাঝে মধ্যেই মনটা কেমন যেন উচাটন হয়ে উঠছে।” কিন্তু এর কারণটা কি? একথা জিগ্যেস করতেই তিনি বললেন, “এই মধুমাধবে থেকে থেকেই আমার এক বাল্যবন্ধুর কথা মনে পড়ছে।” আমি বললাম, “এ তো খুবই স্বাভাবিক, আমারও এমন হয়, তখন আমরা যেকোন একজন আরেকজনের বাড়ি চলে যাই আর সারাদিন ধরে গল্প গুজব হাসি মশকরা করে মনকে শান্ত করি, আমাদের দুজনের ঘরনীরাও পরস্পরের সঙ্গে বেশ ঘনিস্ঠ হয়ে উঠেছেন, আমরা এখন পরস্পরের খুব ভালো ফ্যামিলি ফ্রেন্ড যাকে বলে তাই, আপনিও তাই করুন।” এ কথা শুনে আমি যেন অবিবেচকের মত কিছু একটা বলে ফেলেছি এমন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আরে দুর মশাই! সে কি করে সম্ভব? তিনি একজন দক্ষিন ভারতীয় মহিলা নাম ‘মধুজা’ কেরলে থাকেন, একসময়ে আমার পত্রবন্ধু ছিলেন, সম্প্রতি অনেক চেষ্টা করে এটুকু খবর যোগাড় করেছি যে বর্তমানে স্বামী পুত্র কন্যা নিয়ে দিল্লিতে সুখে সংসার করছেন, আর তাঁর স্বামীতো ব্যাপারটা জানেনই না।” আমি বললাম, “তাহলে তো এই সম্পর্ক আপনার ভূলে যাওয়াই উচিৎ,” একথা শুনে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে পটাইবাবু বললেন, “সেটাইতো পারছি না, এমন আবেগ-তাড়িত সস্পর্ক যে যতই ভূলে থাকার চেষ্টা করি ততই মনে পড়ে যায়, সেই সুগন্ধী রঙ্গীন খামে ভরা কত মিষ্টি মিষ্টি কথা, কত রঙ্গীন ছবি! আমরা তখন ‘শয়নে স্বপনে কিবা জাগরনে’ একজন অপরের জন্য নিবেদিত।” আমি বললাম “সত্যি আপনাদের প্রেম ধন্য, আপনার কথা শুনে আমার লায়লা-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট এদের কথা মনে পড়ে যায়,” একথা বলার পর আমি আবার একটি অবিবেচকর মত কথা বলে ফেলি, “আচ্ছা পটাইবাবু, আপনি বরং আপনার ঐ মধুজাকে ভোলার জন্য বর্তমানে আবার কোন সোস্যাল মিডিয়াতে আপনার মনের মত একজনের সঙ্গে বন্ধু্ত্ব করুন।” এবার একটু মুচকি হেসে পটাইবাবু বললেন, “আপনাকে চুপি চুপি বলছি যে, সেটাও আমি করেছি এবং এক নয় একাধিক। সম্প্রতি তো একজনকে সঙ্গে নিয়ে পুরী পর্যন্ত ঘুরে এলাম।” একথা শুনে আমি বলি “তাহলে আর চিন্তা নেই, যাকে সঙ্গে নিয়ে পুরী পর্যন্ত ঘুরে এসেছেন বাকী জীবনটাও তাকে নিশ্চই স্থায়ি ভাবেই সঙ্গে পাবেন।” এরপর পটাই বাবু বড়ই বিষন্ন বদনে বললেন, “না না ঘন্টুরানী এখন তার সংসার নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পরেছেন যে তাকে আর অন লাইনে পাওয়াই যায় না।” এরপর হটাৎ পটাইবাবু কেমন যেন দার্শনিক হয়ে গেলেন, বললেন “জানেন রায়বাবু, জীবনে এসব অনেক করলাম, পত্রবন্ধু, টেলিফোনে বন্ধু কিম্বা সোস্যাল মিডিয়ায় বন্ধুত্ব…. একটা কথা সার বুঝেছি যে এইসব মিডিয়ার মাধ্যমে দুজনের যোগাযোগ হতেই পারে, এমন কি ঘনিষ্ঠতাও হতে পারে আর তখন যদি দুজনেই Single হয় এবং বিয়ে করা সম্ভব হয় তাহলে বিয়ে করে বাকী জীবনটা সুখী হতেই পারে, কিন্তু শুধু এই ধরনের virtual relation এর জীবন কখনো স্থায়ী হতে পারে না।” একথা বলতে বলতে পটাইবাবু এতটাই ভেঙ্গে পরলেন যে তাঁকে আর বেশী ঘাটাতে ইচ্ছা করল না এবং আমি বাড়ি চলে এলাম। বাড়ি ফেরা ইস্তক আমার সামনে পটাইবাবুর বিষন্ন মুখটা ভেসে উঠতে থাকলো। হটাৎ কি ইচ্ছা হ’ল ডিকশনারীটা হাতে নিয়ে দেখতে চাইলাম virtual শব্দটির অর্থ কি? দেখলাম Oxford Dictionary দুটো অর্থ দিয়েছে (1) Almost or nearly the thing described, but not completely (2) ‘Computing’ not existing in reality but made by software to appear to do so. আমার মনে হয় এই দ্বিতীয় অর্থটাই আমাদের বিতর্কের স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে যথেষ্ঠ অর্থাৎ যা real বা বাস্তবই নয় তা স্থায়ী হবে কি করে?



৫. রুমনি সেন


-চিত্রলেখা?
-বলো সুইট হার্ট
-আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না। আই লাভ ইউ
-মি টু, সোনা
-যখন তোমার ছবিগুলো দেখি তখন আমার ইচ্ছে করে (আর লেখা সম্ভব নয়)
-যাঃ আমার লজ্জা করছে। তবে আমারও ওই সব ইচ্ছে করে।
-তোমার সাথে কিভাবে দেখা করা যাবে
-দেখা করার দরকার কি?
-দরকার কি মানে? ডোন্ট ইউ লাভ মি?
-লাভ ইউ, সুইট হার্ট
-তাহলে আমাকে এড়িয়ে চলো কেন? তোমার ঠিকানা ফোন নাম্বার কিছু দাও না কেন?
-তুমি জান না আমাদের বাড়ি খুব কনজারভেটিভ। বাবা খুব রাগী। জানতে পারলে কেটে ফেলবে।
-আর এই যে রাত দুটোর সময় চ্যাট করছ তাতে বাবা কিছু বলবে না? আসলে তুমি আমায় এখনও বিশ্বাস করতে পারছ না।
-প্লিজ ও কথা বোলো না।
-তাহলে কেন এমন করছ?
-আমাকে একটু সময় দাও, প্লিজ। গুড নাইট... সুইট ড্রিম
-চিত্রলেখা শোনো।

এইভাবেই চলছিল সৌম্য আর চিত্রলেখার প্রেম। প্রায় দুমাস হল ফেসবুকে তাদের
প্রেম চলছে কিন্তু এই মেয়ে এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সে সৌম্যর প্রেমের
কথা, কামনা বাসনার কথা শোনে ও উপভোগ করে, কিন্তু যখনই ঠিকানা বা ফোন
নাম্বার চাওয়া হয় তখনই অফ লাইন হয়ে যায়। সৌম্য দিনে দিনে হতাশ এমন কি
ক্রুদ্ধ হয়ে পড়ছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন সে চিত্রলেখার পরিচয় জানতে পারে।

ট্রেনের কামরায় এক মহিলা সৌম্যর ঠিক মুখোমুখি বসল। বয়স্ক, চুলে ঈষৎ পাক
ধরেছে। তার চোখ, মুখের হাসি সব কিছু সৌম্যর খুব চেনা চেনা লাগল। ভীষণ
চেনা। মহিলার সঙ্গে তারই সমবয়সী আর একজন মহিলা ছিল। দুজনে নিজেদের মধ্যে নানা সাংসারিক গল্প করছিল। সেই চেনা চেনা মহিলাকে দেখতে দেখতে সৌম্য মনে মনে বলল, পেয়েছি, এ তো হুবহু চিত্রলেখা। মুখটা একেবারে কেটে বসানো। নিশ্চয় ওর মা হবে। মহিলা হঠাৎ বলল,
-আমার ছেলের কথা আর বোলো না। রাতদিন কাজে ব্যস্ত, নাওয়া খাওয়ার সময় পায় না। কোম্পানি ওকে দিন রাত খাটিয়ে নিচ্ছে কিন্তু মাইনে দেয় সামান্য। ওর
খাটুনি চোখে দেখা যায় না। রাত জেগেও ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করে।
-কি করা যাবে লেগে থাকুক, একসময় নিশ্চয়ই উন্নতি হবে।
-সেই আশাতেই তো আছি। জানো আমার ছেলে কম্পিউটারে ভীষণ এক্সপার্ট। ফটোশপ টপ... সবকিছু খুব ভালো পারে। এই তো সেদিন আমার পুরনো দিনের একগাদা ফটো চাইল, বলল ফেক আইডি বানাতে হবে। অফিসের কাজে দরকার। তাই নিয়ে সারাদিন পড়ে রইল, নাওয়া খাওয়া ভুলে, এমন কাজ পাগল ছেলে।
সৌম্যর কান মাথা ভোঁ ভোঁ করছিল। সে বলল,
-কাকিমা আপনার ছেলের নাম কি সুজয়? মানে কিছু মনে করবেন না। আমি সুজয় নামে একজনকে জানি, কম্পিউটার খুব ভালো জানে আর ফটোশপ ফেকাইডিতে তো একেবারে মাস্টার। লিলুয়া থাকে। ওখানে সবাই ওকে চেনে।
ছেলের বিষয়ে প্রশ্ন করায় মহিলা খুব খুশী হল।
-না আমার ছেলের নাম শুভ্রদীপ। আমরা মানকুন্ডু থাকি। আমার ছেলেও খুব ফেমাস। তুমি ইন্টারনেট পারো? আমার ছেলে পারে। ইন্টারনেটে শুভ্রদীপ ভট্টাচার্য লিখলেই ওকে দেখতে পাবে।
-আপনার কোন মেয়ে আছে?
-না আমার একই ছেলে।
সেদিন রাত্রে চিত্রলেখা চ্যাটে এল
-কি করছ সোনা?
-আমি কি করছি তাতে তোর কি মা****র শুভ্রদীপ। শুওরের বাচ্চা, মাকে বেচে
খাচ্ছিস? ভালো ভালো। কাল রাতে পাঠিয়ে দিস। দশটা টাকা দেব।
চিত্রলেখা (বা শুভ্রদীপ) দমার পাত্র নয়
-চোপ। তোর তো শালা মেয়েছেলে দেখলে ***এ লাল পড়তে থাকে। এতদিন তো দিব্যি প্রেম চালাচ্ছিলি। দাঁড়া সালা, চ্যাটিং এর স্ক্রিন শট নিয়ে সব পোস্ট করব।
-যা যা করিস, আমার *** ছিঁড়বি। হ্যাঁ আমার মেয়েছেলে দেখলে লাল পড়ে আর তোর তো শালা ব্যাটাছেলে দেখলে লাল পড়ে। মুখে লিপস্টিক মেখে রাস্তায় দাঁড়া।
তাতেও দুটো পয়সা আসবে।
রাগে গরগর করতে করতে সৌম্য চিত্রলেখার প্রোফাইলে গেল। একসাথে রিপোর্ট ও
ব্লক করবে। কিন্তু দেখল চিত্রলেখা তাকে আগেই ব্লক করে দিয়েছে।









বিপক্ষেঃ




১. রানী সিনহা

ভারচুয়াল সম্পর্কে স্থায়িত্ব অবশ্যই আছে, আমি এর পক্ষেই কিছু কথা বলতে চাই...আমি কিছুতেই স্বীকার করবো না ভারচুয়াল এই সম্পর্কের কোনও স্থায়িত্ব নেই ।

কত মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়, যাদের আমরা চিনি না, কিছু জানিনা তারা কেমন মানুষ, কোথায় থাকে, কি তার পেশা ।

ফেসবুক এ আসতে হলে তাদের একটা ছবি দিতে হয়, তাই সেই সুবাদে ওরা আমার কাছে পরিচিত। আমি একে Face book বা মুখ-বই বলতে পারবো না।

আমার কাছে এটা একটা সোসাইটি। একটা পরিবারের মত, পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া, খুনসুটি, সবকিছু আছে এখানে, আবার আবেগ আছে পুরো মাত্রায় ।

শোক, শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা, সন্মান, ভালোবাসা, মেলামেশা, আন্তরিকতা সব কিছু আছে এখানে। নিজেদের জানা অজানা অনেক কিছুই আদান প্রদান হয়, আর এই ভাবেই দিনের দিন কেটে যায়। কিন্তু একবারও মনে আসে না, এরা আমাদের কেউ নয়। সকলের অজান্তেই আপন হয়ে যায় সবাই কখন আমরা বুঝতেও পারি না। এই ভাবেই কখন একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

আর এই সম্পর্ক গুলোর মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে আস্তে আস্তে কেমন স্থায়িত্বও এসে যায়। তখন মনে হয় ওরা আমার পরিবারের কেউ। সুখে-দুঃখে খোঁজখবর নেওয়া, শরীর ঠিক আছে কিনা, তার জন্য আবার সাবধান করে দেওয়া, এই ভাবেই আস্তে আস্তে স্থায়িত্ব এসে যায় এবং সেটা চিরস্থায়ী হয় । বাস্তবিক জীবনে স্কুল কলেজ বা সংসারে আমরা অনেকের সঙ্গেই মেলামেশা করি কিন্তু সকলের সঙ্গে কি স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠে ?

তেমনি এই ভারচুয়াল জগতেও কিছু কিছু ক্ষেত্রে আবেগ থাকে আর আমাদের এই আদান প্রদান, লেখালিখির মাধ্যমে স্থায়ী সম্পর্ক গড়ে ওঠে ।



২. স্বপন দেব

সভার মোশন এর সপক্ষের বন্ধুগণ এবং শ্রদ্ধেয় পাঠক-পাঠিকা মণ্ডলী,

এটা যে একটা বিতর্কের বিষয় হতে পারে, আমি ভাবতেই পারিনা ! সপক্ষের বন্ধুরা যে কি-বোর্ড এ টাইপ করে আপনারা বক্তব্য পেশ করছেন, সেটাও কিন্তু একটা ভার্চুয়াল কি বোর্ড ! সভা এবং সপক্ষের বন্ধুরা স্বীকার করে নিয়েছেন যে, ভার্চুয়াল সম্পর্কে আবেগ আছে ! আমার যৌবনকালে বিতর্ক বা প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার বিষয় থাকতো, বিজ্ঞান দিয়েছে বেগ, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে আবেগ ! আর আমার বার্দ্ধক্যে এসে শুনছি, এক ধরণের সম্পর্ক দিয়েছে আবেগ কিন্তু, অনিশ্চিত করেছে তার বেগ বা স্থায়িত্ব ! যাই হোক, সপক্ষের বন্ধুরা এবং সভা যে এটাকে আবেগ বলে মেনে নিয়েছেন, আমি তাতেই খুশি ! একটা সম্পর্কের স্থায়িত্ব নির্ভর করে দুটো বিষয়ের ওপর। একটি আবেগ বা ভালোবাসা এবং আর একটি পারস্পরিক বিশ্বাস এর ওপর। আপনাদের স্বীকারোক্তিতেই পরিষ্কার যে আবেগ বা ভালোবাসা এখানে বিদ্যমান। বাকি থাকে, পারস্পরিক বিশ্বাস। সেটা কিন্তু, ভারচুয়াল বা রিয়ালিটির ওপর নির্ভরশীল নয়।

পুরুষ মাত্রেই By nature, polygamist. এটা মেয়েরা তো জানেই, সারা বিশ্বই জানে। সব রকম সম্পর্কেই মেয়েরা এটা মেনে নিয়েই সম্পর্ক টিঁকিয়ে রাখে ! রাখতে বাধ্য হয়। এর সঙ্গে ভার্চুয়াল বা রিয়ালিটির কোন সম্পর্ক নেই।

এবার বলুন তো আমার সপক্ষের বন্ধুগণ , রাধাকৃষ্ণ বা কৃষ্ণ-দ্রৌপদীর সম্পর্ক কি ভার্চুয়াল ছিল, না রিয়েলিটি ছিলো ? মহাভারতীয় যুগ থেকে আজ অবধি কিন্তু তাঁদের সম্পর্কের আবেগ এবং স্থায়িত্ব দুটোই বর্তমান ! আচ্ছা বলুন তো, রোমিও-জুলিয়েট বা ওথেলো-ডেসডিমোনার সম্পর্ক ঠিক কি ছিলো ? নাগ-রাজ কন্যা উলূপীর সঙ্গে অর্জুনের মাত্র একরাত সহবাস হয়েছিলো। তার পরিণতিতে উলূপী-অর্জুনের সন্তান কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের পক্ষে যোগদান করে বীরের মৃত্যু বরণ করেন। এটাকে কি বলবেন আমার সপক্ষের বন্ধুগণ ? আসলে ভার্চুয়াল শব্দটিই নতুন প্রজন্ম, যাকে G নামে অভিহিত করা হয় তাঁদের জন্যে। এই G নামক প্রজন্ম টি কিন্তু সদা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল। 2G থেকে 4G তে আসতে এদের বেশী সময় লাগেনা। স্থায়িত্ব কথাটাই আপেক্ষিক। বিশ্ব-চরাচরে কোন কিছুই চিরস্থায়ী নয়। আর প্রেম-হীন, বিশ্বাস-হীন নিরুপায় অভ্যস্ত দাম্পত্যের থেকে যে সম্পর্ক আবেগময়, ভালবাসায় প্রাণবন্ত তার মূল্য অনেক বেশী।



৩. অনুপম দাশশর্মা

প্রথমতঃ স্থায়িত্বের কোন বাঁধাধরা সংজ্ঞা নেই। আপেক্ষিক তত্ত্বের তত্ত্বতালাশ ঘাঁটলে দেখা যাবে সময়ের আশির্বাদপুষ্ট বাছাই ভাগ্যধর লিঙ্গ নির্বিশেষে কোথাও কোথাও দীর্ঘ সম্মতিতে স্থায়িত্বের সুবিধা পায়। মূল ব্যাপারটা যেখানে সম্পর্কের ভূমিকায় জড়িয়ে আছে তখন যে কথাটি চলে আসে তা হলো আবেগ। আবেগ সম্পর্কের প্রথম বর্ণমালা।

আবার ব্যক্তিকে সবসময় ছাপিয়ে যায় সমষ্টির দাপট। তাই ভার্চুয়াল রিলেশনে ব্যক্তির ইচ্ছা-ঘূর্ণিতে বিপাকে পড়ে কেউ নিছক আবেগকে মুকুট পড়ালে বোধহয় সম্পর্ক'র প্রতি অবিচার করা হবে।

কেউ একজন বা দুজন, দশজন উদাহরণ হয়ে দাঁড়াতে পারে না বেশীর ভাগ শুভবুদ্ধি ধারকদের। প্রতিদিন যাঁরা ছায়ার আড়ালে মনের যাবতীয় সুখ আহ্লাদ অকাট্য উপস্থিতিতে এই ভার্চুয়াল জগতে হাজির করেন, রিয়েল স্টেজে তাঁদের কজন'কে এই বেগবান কঠিন জীবনে আমরা সেভাবে পাই?

সব জায়গায় কিছু বেয়াদব কৃষ্টি(?) রিপুতাড়িত হয়ে আঁচড় কাটে সৌহার্দে, ভার্চুয়ালি সে মুখগুলো সক্রিয়, ক্ষিপ্রও ততোধিক। কিছু করার নেই। কিন্তু বাকী সংস্কৃতিমুখর সুজনদের অভাব কি অস্বস্তি বাড়ায় না কোনসময় অন্তর্জালের যান্ত্রিক বিভ্রাটে?

হয়। হতেই হয়। আর তখনি স্থায়িত্বের আস্থাভোট হই হই করে জয়ী হয়ে ওঠে।



৪.অরুণ চট্টোপাধ্যায়


দিন যত যাচ্ছে পৃথিবী তত ছোট হয়ে আসছে। কিন্তু মানুষের কাজের গতি ততই বেড়ে চলেছে। ইঁদুর দৌড়ের এই যুগে মানুষ হারিয়ে ফেলেছে তার জীবনযাত্রার স্বাভাবিক ছন্দ। মানুষের মনের ওপর চাপ বেড়েই চলেছে দিনের পর দিন। নানা সমস্যার চাপে মানুষের প্রতি মুহূর্তেই উঠছে যেন নাভিশ্বাস। মন চায় একটু বিশ্রাম কিন্তু পায় না। আপন জনেরাও যে যার নিজ নিজ কর্মে ব্যস্ত। তাছাড়া আজকের দিনে পরিবারগুলি হয়ে পড়েছে পরমাণু-সদৃশ। পড়াশোনা আর রুজি রোজগারের টানে পরিবারের অন্যান্যরা ছড়িয়ে পড়ছে দেশ থেকে দেশান্তরে।

একাকীত্ব মানুষের কাছে একটি অভিশাপ। মানুষের মনে গভীর আর সুদূরপ্রসারী এক বিষবৃক্ষের শেকড় গেড়ে দিতে পারে এটি। হতাশা আর অবসাদ তার জীবনে আনতে পারে এক চরম দুর্দিন। তাই এই অবস্থায় মানুষ চেয়েছে তার প্রতি মুহূর্তের একটি মনের মত সঙ্গী। সোশ্যাল নেট ওয়ার্কিং সাইটগুলি বিশেষভাবে ফেসবুক সেই সুযোগ করে দিয়েছে। বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষদের সঙ্গে তার যোগাযোগের দরজা খুলে দিয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এই সম্পর্ক বন্ধু নামে অভিহিত হলেও মানুষ পরবর্তী পর্যায়ে অন্য নানা নিকট সম্পর্ক পাতিয়ে বসে।

ভার্চুয়াল কথাটার মানে হল যার অস্তিত্ব আছে কিন্তু তা ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাধারণতঃ সোশাল নেট ওয়ার্কিং সাইটগুলোর সম্পর্কেই এই ভার্চুয়াল সম্পর্কের প্রশ্ন ওঠে। এই সম্পর্কগুলির সম্পর্কে বিস্তারিত কেউ আমরা বিশেষ জানতে পারি না বলেই হয়ত এ প্রশ্ন ওঠে।

মানুষ বুদ্ধিমান প্রাণী। সে জানে শুধুমাত্র আবেগ সর্বস্ব হয়ে বাচা যায় না। তাই সমস্ত “অলীকত্ব” ঘুচিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে বাস্তবসম্মত সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহী ও উদ্যোগী হয়।

এটা ঠিক যে এই ভার্চুয়াল সম্পর্কের মোহে পড়ে বহু প্রেমের পরিণতি হতাশাগ্রস্ত ও বিভিন্ন দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে। কিন্তু আবার এটাও ঠিক যে বহু প্রেমের ভার্চুয়াল সম্পর্কগুলি বিবাহ নামক স্থায়িত্বের ছোঁয়া পেয়ে সুখে ঘরসংসারও করছে।

ইদানীং ফেসবুক তার ভার্চুয়াল খোলসখানা ছেড়ে ফেলতে উদগ্রীব। ফেসবুকের বন্ধুদের মধ্যে বাস্তবসম্মত দেখাসাক্ষাৎ, নানা অনুষ্ঠান, বনভোজন, সমাজসেবা ইত্যাদি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বন্ধুত্বের টানে দূর প্রবাস এমন কি বিদেশ থেকেও ছুটে আসছেন এরা নানা অনুষ্ঠানে। এ বিষয়ে চিলেকোঠা গ্রুপটি বেশ কিছুটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকাও পালন করছে তার সাম্প্রতিক কাজকর্ম এমনি ইঙ্গিত দেয়। শুধুমাত্র আবেগতাড়িত হয়ে কি এরা এত কিছু করতে পারতেন? একটা স্থায়িত্বের নির্দিষ্ট লক্ষের দিকেই হয়ত এগিয়ে চলেছে আজকের ফেসবুক-জগত।



৫. বেলাল হোসেন

ভার্চুয়াল রিলেশনশিপে আবেগ আছে, স্থায়িত্ব নেই ? তাই কি ? ক্ষেত্র বিশেষে তা সত্য হতে পারে, কিন্তু, ইংরেজিতে যাকে বলে, জেনেরালাইজড, তা কিন্তু নয়। বেশ কিছু ঘটনার আমি সাক্ষী যেখানে, সোশ্যাল মিডিয়াতে পরিচয় হয়ে, পরে তা বৈবাহিক সম্পর্কে পরিণতি লাভ করেছে। কিছুদিন আগে একটি অপরিণত মেয়ে আমার চেম্বারে দেখাতে আসে, সে ছিল গর্ভবতী। আমি যখন তার মাকে বলি ‘এত বাচ্চা মেয়ের বিয়ে দিলেন, তাও ঠিকমত শিখিয়ে পড়িয়ে দিলেননা ! আপনাদের মত বাবা মাকে তো পুলিশে দেওয়া উচিৎ ! সরকার থেকে এত চেঁচামেচি, এত প্রচার, সব জলাঞ্জলি যাচ্ছে !’ তার মায়ের উত্তর ছিল, ‘আমরা কি দিয়েছি ! ..দেখছেন না, আমরা হলাম ঘোষ, আর মেয়ে হল কিসকু’। বললাম, ‘তাতে কি হয়েছে, সে তো হতেই পারে’। আসল কথা হল মেয়েটি ক্লাস টেন-এ পড়াকালীন চ্যাট করে বন্ধু যোগাড় করে পালিয়েছিল। চেন্নাইয়ে। ছেলেটি নেহাত ভালো , মেয়েটি গর্ভবতী হওয়ায় বেশ ভয় পেয়ে যায়। তার সেখানকার বন্ধুদের পরামর্শে ফিরে আসে।

আমরা নিজেরাও কি কিছু ভার্চুয়াল সম্পর্ককে আন্তরিকতার স্পর্শে জড়িয়ে নিইনি ? হ্যাঁ, পাঁচশো বন্ধুর মধ্যে হয়তো অন্ততঃ পনেরটা সম্পর্ক সামাজিকতার বন্ধনে বাঁধা হয়েছে। বেনোজল নিশ্চয় বেশি।

মিসড কল শেষ পর্যন্ত মিসেস কল এ পরিনত হওয়ার উদাহরণও আছে । প্রফেসনাল কারণে, আমার পক্ষে এসব ঘটনা জানার সুযোগ বেশি।

আমার ছেলে ব্যাঙ্গালোরে থাকে, হোস্টেলে। গত বছর, হঠাৎ, এক সন্ধ্যায় ওর বিব্রত ফোন পেয়ে বিপদে পড়ে গেছলাম, ওর পাশের রুমে একটি ছেলে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে, সেই পরিস্থিতিতে পড়ে আমার ছেলে ভয় পেয়ে বমি টমি করে ভীষণ প্রবলেমে পড়ে যায়, আমি আমার ডক্টর’স গ্রুপের ওয়ালে এ নিয়ে একটা লেখা পোষ্ট করি, ব্যাঙ্গালোরে মিলিটারিতে কর্মরতা এক ডাক্তার, যে আমাদেরই কলেজ থেকে পাশ করেছে, আমি পাশ করবার অন্ততঃ পনের বছর পরে, যাকে আমি কোনোদিনই দেখিনি, সে ব্যাপারটা জানা মাত্র আমার ছেলের ফোন নম্বর চায়, এবং তৎক্ষণাৎ তার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং করে দেয়।

বন্ধুপুত্র, আই আই টি তে পড়ত। নেট এ বন্ধুত্বের সূত্রে অস্ট্রেলিয়াতে ইণ্টার্ণশিপ যোগাড় করেছে, থাকার জায়গা পেতে সুবিধা হয়েছে, আবার পাশ করবার পরে চাকরিও জুটিয়েছে। হয়তো সুবিধাবাদিতা, কিন্তু যিনি উপকার করেছেন, তিনি তো হৃদয় দিয়ে করেছেন।

আসলে ব্যাপারটা নির্ভর করে মানুষের মানসিক কাঠামোর উপর। একজন স্বার্থপর মানুষ , তার চোখের সামনে যতই ভালোমানুষ থাকুক, যারা উপকার করতে পিছপা নয়, সেরকম লোকেরও প্রয়োজনের সময়, সেই স্বার্থপর মানুষের দেখা পাওয়া যাবেনা। সে কিছুনা কিছু অজুহাত খাড়া করবেই। আর সে যদি একটু বেশি বিদ্যে বুদ্ধি ধরে, তাহলে তো আর কথাই নেই। সোস্যাল মিডিয়াতে সে জ্ঞান দিয়ে ফাটিয়ে দেবে। আবেগের অস্থিরতায় অস্থির হয়ে পড়বে। বাস্তবে, কাজের লোকেরা চিরদিনই নীরবে কাজ করে গেছে, তারা প্রচারের আলো থেকে একটু দূরে থাকতেই ভালবাসে; সে মানুষের মাঝেই হোক, কি ভার্চুয়াল জগতেই হোক। কিন্তু, ভার্চুয়াল জগৎটা যেহেতু নিজের ঢ্যাঁঢরা পিটবার জায়গা, তাই সেখানে ঢক্কানিনাদের লোকজনই বেশি। তবে, তার জন্য সিস্টেমকে দোষ দেওয়া যায়না।

বাস্তব জগতের একটা ‘আবেগ আছে, স্থায়িত্ব নেই’ এর মজার উদাহরণ দিয়ে লেখা শেষ করি। একজন বেশ গরীব এক রোগী ক্লিনিকে ভর্তি হল, ভর্তির সময়েই সে জানিয়ে দিয়েছে, তার কতদূর কী ক্ষমতা; সেই অনুযায়ী একটা বাজেট করে তার চিকিৎসা চলছে। মাঝপথে একদিন, তার কোন ধনী আত্মীয় (যে আমারও হয়তো অচেনা নয়) হাজির হল। সে তো এসেই, আবিষ্কার করবে, ‘আরে কী চিকিৎসা হচ্ছে তোর এটা ! এই হচ্ছেনা, সেই হচ্ছে না ..চলতো দেখি, আমি নিজে ডাক্তারবাবুকে চিনি, তাঁর সঙ্গে আমি নিজে কথা বলবো....’ । যথাসময়ে সেই মক্কেল এবারে আমার রুমে হাজির হবে, আমি তার বাক্যবাণ শেষ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে, তারপর বলবো , ‘আসলে আপনার আত্মীয় বেশ গরীব মানুষতো, তার পক্ষে হয়তো অসম্ভব, আপনি যদি এই দামী ওষুধগুলি কিনে দেন..’ এই বলে তাঁর হাতে একটি ওষুধের লিস্টি ধরিয়ে দেব। এর পর আর সেই ভদ্রলোকের টিকিটির সন্ধান পাওয়া যাবেনা । তিনি তো সেই গরীব মানুষটির হাতে ততক্ষণে সেই মেডিসিন স্লিপটি ধরিয়ে দিয়ে কেটে পড়েছেন। কী সমাজে, আর কি ভার্চুয়াল জগতে, সর্বত্রই এই ধরনের সিউডো ( Pseudo ) পরোপকারী লোক সংখ্যায় বেড়ে গেছে, তাই আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় ‘আবেগ আছে, স্থায়িত্ব নেই’ । এতে তর্কের কী আছে। এই নিয়েই চলব।

বিতর্ক বিভাগ - চিলেকোঠা সরগরম

এই সংখ্যার বিষয়ঃ
সমকামিতা ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী

(বিশেষ সূচনাঃ এই বিভাগে প্রকাশিত প্রতিটি মন্তব্য অংশগ্রহণকারীর একান্তই নিজস্ব মতামত, এ বিষয়ে চিলেকোঠা অয়েবজিন কোনোভাবে দায়ী নয়)



পক্ষেঃ


১) রূমনি সেন

সমকামিতা প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ঘটনা-


সমকামিতা হল এক অস্বাভাবিক, অপ্রাকৃতিক,অনুচিত মানবাধিকার বিরোধী কাজ। দুঃখের বিষয় এটা উচিত কি অনুচিত এ নিয়েও বিতর্ক হচ্ছে। মহাশ্বেতা দেবী বলেছিলেন,এমনই এক সমাজে আমরা বাস করি যেখানে আকাশ নীল, গাছের পাতা সবুজ, জল তরল এবং নীচের দিকে যায় ইত্যাদি স্বতঃসিদ্ধ বিষয়েও বহুপাক্ষিক আলোচনার প্রয়োজন হয়।

দুটি পুরুষ পরস্পরের সাথে স্বাভাবিক যৌন সম্পর্ক করতে পারে না, প্রাকৃতিক কারনে। প্রকৃতির নিষেধ আছে বলে কোন পশুপাখি সমলিঙ্গের মধ্যে সেক্স করে না । সেক্স এর উদ্দেশ্যই হল রিপ্রোডাকশন, যেটা বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে সেক্স এর ফলেই সম্ভব।

সমকামী বিবাহিতরা অনেক সময় টেস্টটিউব বেবী বা দত্তক সন্তান পালনের কথা বলে। কিন্তু এই সন্তানেরা তাদের স্বাভাবিক মা বা বাবাকে পায় না,এবং একজনের সাথে তাদের রক্তের সম্পর্ক থাকে না কোন ।এই সব শিশুরা পরবর্তী কালে Identity Crises এর শিকার হয়, সমাজে নিজেদের স্থান খুঁজে পায় না ।

সমকামিতাপন্থীদের নানা অপযুক্তি আছে । এই সব তার্কিকদের বক্তব্য হল, সমকামিতা মানুষের একটা অধিকার, সুপ্রীম কোর্টের রায় এই অধিকার খর্ব করেছে।

বস্তুত সমকামিতা একটা অসম্ভব ব্যাপার। যখন দুজন পুরুষ সেক্স করে তখন একজন স্ত্রীলোকের ভূমিকা পালন করে, এবং সে তার শরীরটা ব্যবহৃত হতে দেয়, যাতে অপর পুরুষটি সেক্সের আনন্দ উপভোগ করতে পারে। এটাই মানবাধিকারের সবচেয়ে বড় উল্লঙ্ঘন।

সমকামিতার ফলে এডস রোগের মহামারী শুরু হবে,তা' বলাই যায়। শুধুমাত্র এডস মহামারী থেকে বাঁচতে সমকামিতা বর্জনীয়। বাৎস্যায়ন বলেছিলেন, যে ব্যক্তি অকাম নারীতে (যে আসলে পুরুষ ! ) অভিগমন করে সে অনন্ত নরকের অধিবাসী হয়।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে দুজন ব্যক্তি সেক্স করছে, অথচ একজন আনন্দ উপভোগ করছে আর একজন যন্ত্রণা, এটা ভারতীয় ঐতিহ্যের পরিপন্থী। সুপ্রীম কোর্টের রায় বিশেষভাবে কেবল সমকামিতার বিরুদ্ধেই দেওয়া হয় নি, বরং সমস্ত আনন্যাচারাল সেক্স এর বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে। পশুর সঙ্গে মানুষের সেক্সও এই ক্যাটিগরিতে পড়ে।

সব শেষে বলি, যা' প্রকৃতি-বিরুদ্ধ, তা' কখনো গ্রহনীয় হতে পারে না, নানা কারণে প্রকৃতি-বিরুদ্ধতায় মানুষের সভ্যতা বহুবার ধ্বংস হয়ে গেছে অতীতে।



২) শ্রীশুভ্র

একথা বলাই বাহুল্য সমকামিতা ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে খাপ খায় না! বরং হতবাক হতে হয় এই বিষয়ে বিতর্ক উঠতে দেখেই! যারা বলবেন বহুবিচিত্র ভারতীয় সংস্কৃতিতে সবই খাপ খেয়ে যায়, তাদের সবিনয়ে বলি, তবে তো বর্তমান ভারতীয় আর্থসামাজিক রাজনৈতিক পরিসরের ব্যপক দুর্নীতিকেও ভারতীয় সংস্কৃতি বলে গর্ববোধ করতে হয়!

না, কোনো ভারতীয়ই যেমন দুর্নীতি চলছে বলেই তাকে দেশীয় সংস্কৃতি বলে মেনে নেবেন না, তেমনি সামান্য কজন ব্যতিক্রমী প্রচলিত সুস্থ মানসিকতার বিপ্রতীপে অবস্থানরত মানুষের প্রবৃত্তিকে ভারতীয় সংস্কৃতি বলে মেনে নিতে আপামর ভারতীয়র মতো আমরাও অপারগ! দুঃখিত !

এবার আসা যাক আমাদের ঘরগেরোস্থালীর পরিসরে !
কটি পরিবারে সমকামী সম্পর্কের চর্চা হয়? ভাবা যায়, আমাদের ছেলেমেয়েরা ঘরেঘরে সমকামের চর্চা শুরু করে দিয়ে আজীবন সুস্থ সুন্দর জীবনযাপন করছে? কজন চাইবে , তার মেয়েটি আর একটি মেয়ের সাথে ঘরসংসার করছে দেখতে? কজন, ছেলের বউয়ের বদলে ছেলের বরকে বরণ করবেন বড়ো মুখ করে? এবং সবচেয়ে বড়ো কথা আমাদের ভারতবর্ষীয় মানসিকতায় আমরা কজন চেতন অবচেতনের অতলে সমলিঙ্গের সঙ্গসুখ কামনা করি ? যারা তথাকথিত সমকামী বলে ঢাক পেটাতে পছন্দ করেন, খোঁজ নিলে দেখা যাবে হয়ত অনেকেই আজীবন সমলিঙ্গ সঙ্গসুখ ও সংসার যাপনের দায়িত্ব কর্তব্য সম্বন্ধেও ওয়াকিবহাল নন ততটা! ক’দিনের মোহ ক’দিন টিকবে কে বলতে পারে ?

যারা সনাতন ভারতীয় বৈদিকসংস্কৃতির দৃষ্টান্তের কথা বলে সমকামিতার পক্ষে কোলাহল করেন তাঁরা ভুলে যান যে, সে রামও নেই, সে অযোধ্যাও নেই! একদিন তপোবনে গুরুগৃহে অধ্যয়ন থেকে বাণপ্রস্থ গমন সবই ভারতীয় সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত ছিল বলেই আজকের যুগে তার অপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে যদি বিতর্ক না ওঠে, তবে সেই পুরানো কাসুন্দী ঘেঁটে আর লাভ নেই! বুঝতে হবে পরিবর্তিত সহস্রাব্দের ভারতীয় সংস্কৃতিতে সমকামিতা অচল এবং অগৌরবের! যে প্রবণতা সমাজ সংসারে শতাংশের হারে অতি নগন্য তাকে আর যাই হোক দেশীয় সংস্কৃতির স্বরূপ বলে চালানোর প্রয়াস অযৌক্তিক এবং অবৈজ্ঞানিক! তাই সুস্থ বিবেচনার পরিধিতে একথা স্বীকার্য, যে ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গনে সমকামিতা অচল!

৩) অরুণ চট্টোপাধ্যায়

কাম শব্দের আভিধানিক বহুল প্রচলিত অর্থ হল একটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের সঙ্গে অপর একটি প্রাপ্তবয়স্ক মহিলার প্রকৃতি-সম্মত যৌনাচারের অভিলাষ । বলা বাহুল্য প্রকৃতি তার সৃষ্ট জীব বা উদ্ভিদের জীবনধারাকে প্রবাহিত রাখতেই উন্মুখ। আমরা সকলেই জানি বিপরীতধর্মী যৌনমিলন ছাড়া জনন বা Reproduction সম্পন্ন হয় না আর তৈরি হয় না ভবিষ্যৎ প্রজন্ম । অর্থাৎ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যই প্রকৃতি নরনারীর মধ্যে কাম নামক ইচ্ছাটির সৃষ্টি করেছেন বলে ধরে নেয়া যেতে পারে ।

ভারতীয় সংস্কৃতির আবহমণ্ডলে সমকামিতা স্থান পায় না । কারণ এই সংস্কৃতি মনে করে প্রাপ্তবয়স্ক নরনারীর কামচর্চা সঠিক পথে পরিচালিত হয়ে উভয়ের দেহ ও মনকে পরিতৃপ্তি দিক। কিন্তু সমকামিতা কিছুকালের জন্য কিছু ব্যক্তিকে পরিতৃপ্ত করলেও দীর্ঘকালের জন্য একটি সমাজকে তা পরিতৃপ্ত করতে পারে না । মানুষ সমাজবদ্ধ প্রাণী হবার সুবাদে সমাজের প্রতি তার কিছু দায়িত্বকে অস্বীকার করা যায় না । কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনে ঘাটতি থেকে যেতে পারে যদি সমকামিতা নামক আত্মকেন্দ্রিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় ।

“প্রকৃতি-বিরুদ্ধ্ব” এই কথাটা অনেকের কাছে হয়ত অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। অনেকে মনে করেন মানুষ বিজ্ঞান জানে তাই প্রকৃতি তার কিছুই করতে পারবে না । তাই তারা প্রকৃতির বিরুদ্ধে অনেক কিছু করবার চেষ্টা করে বা করে । তারা নদীর গতিপথে বাঁধ দিয়ে তার স্বাভাবিক পথ রুদ্ধ করে । পাহাড়ে কংক্রিটের জঙ্গল বানিয়ে পাহাড়কে অনাবশ্যক ভারাক্রান্ত করে । বিস্তৃত সাগর চায় তার একটি খোলামেলা বালুতট । সেখানে নির্মিত হয় সুসজ্জিত বহুতল । প্রকৃতি কিছুকাল সহ্য করে কিন্তু চিরকাল নয় । আর প্রকৃতির প্রতিশোধ কত নির্মম হয় সেটাও কি খুব কম বার আমরা দেখেছি ?

প্রকৃতি চায় নরনারীর যৌনাচার – সুন্দর ও অনাবিল একটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে । প্রকৃতির কথা থাক মানুষ কি চায় না ? কিন্তু সমকাম বা homosexuality কি সেই অভিলাষ পূরণ করতে পারবে ? সমকাম শুধু কিছু নারীপুরুষের অস্বাভাবিক পথে যৌন তৃপ্তির সহায়ক হতে পারে এর বেশী কিছু নয় । তাছাড়া যৌন সংক্রমণ ঘটিত রোগগুলি যা সারা পৃথিবীকে গ্রাস করছে ক্রমশ তার কি আরও প্রসার কি হবে না এর ফলে ?

৪) নারায়ণ রায়
“সমকামিতা ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খায় না”--, আমি এই যুক্তিকে সমর্থন করি। অনেকেই বলছেন একে অপরাধ বলার অর্থ মানুষের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করা।

তাদের কাছে আমার প্রশ্ন, মানুষের যৌন কামনার প্রকার ভেদের কি কোনও শেষ আছে ? অর্থাৎ ঠিক কোন যায়গায় আপনি লক্ষণ রেখাটি টানবেন? যার পর, আর এক পা এগোলেই সেটা অপরাধ কিম্বা বিকৃত রুচি বলে বিবেচিত হবে?

আজ যদি সমকামিতাকে মানুষের মৌলিক অধিকার বলে মেনে নেয়া হয়, তাহলে তো আগামীকাল দুজন প্রাপ্তরয়স্ক polygamist, incest বা এইরকম আরও অনেকে আছেন যারা তাদের সপক্ষেও নানান যুক্তি দেখিয়ে বলবেন যে তারাও অপরাধী নন । আর এদের সবাইকে ছাড় দিলে আমাদের সমাজটা কোথায় পৌছবে ভাবতেও আতঙ্ক হয়।

কথাটা হচ্ছে ‘ভারতীয় সংস্কৃতি’র সঙ্গে খাপ খায় কি না? অনেকে এ ব্যাপারে আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রের উদাহরণ টানেন, তাঁদের সবিনয়ে বলি, এই শাস্ত্রগুলি ‘তৎকালীন’ সমাজ ব্যবস্থার অভিজ্ঞতায় আমার আপনার মত সাধারন মানুষেরই লেখা । সেযুগের সমাজে সামগ্রিক অনুশাসন ছিল খুবই দুর্বল। আসলে তৎকালীন সমাজের উচ্চস্তরের ব্যক্তি যথা রাজা, ব্রাহ্মণরাই ছিলেন আইনের প্রণেতা, নিজেদের ইচ্ছে মতন যৌন কামনা চরিতার্থ করার কথা ভেবেই তারা আইন প্রণয়ন করতেন, সেজন্য সমাজে অনেক স্বেচ্ছাচারিতাও ছিল। আচ্ছা, আজকের দিনে কি শুধু কূল রক্ষার তাগিদে আপনার অষ্টম বর্ষীয়া কন্যাকে একজন সত্তর বর্ষীয় বৃদ্ধের ত্রয়োদশ পত্নী হিসেবে বিবাহ দেবেন ?

তাই শাস্ত্রের কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। এবার একটি আসল কথায় আসা যাক, সমকামিতায় সন্তান জন্মানো সম্ভব নয়, সমর্থকেরা বলবেন, “কোই বাত নেহি, সন্তান দত্তক লেগা,”। একবার ভাবুন তো-- একটি শিশু জ্ঞান হয়ে দেখছে তার কোন মা নেই, আছে দু-দুটো মূলোর মতো গোঁফ আর খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা টেকো-মাথার বাবা, অথবা শাড়ি কিম্বা শালোয়ার-কামিজ পরা দু দুটো পটেশ্বরী মা যারা কেউই তার জন্মদাত্রী নন।

সেক্ষেত্রে সে কি আর পাঁচটি সাধারণ শিশুর মত স্বাভাবিক ভাবে মানুষ হবে ? অথচ পাশের বাড়িতেই তার বন্ধুর একটা টেকো বাবা আর একটা পটেশ্বরী মা দুই-ই আছে, শুধু তাই নয় একদিন সে দেখলো তার বন্ধুটি মায়ের কোলে বসে মায়ের বুকের দুগ্ধ পান করছে, তবে সে কেন বঞ্চিত ?

সব শেষে একটা কথা বলি, পৃথিবীতে যে কোন মতবাদেরই সমথর্করা মনে করেন যে, তাঁর মতবাদটাই শ্রেষ্ঠ এবং সবাই সেই মতবাদ অনুসরন করুক। যেমন একজন রাজা চান সারা পৃথিবীতে আবার রাজতন্ত্র ফিরে আসুক, একজন সাম্রাজ্যবাদী চান সারা পৃথিবী তার অধীনস্ত থাকুক, একজন কম্যুনিস্ট চান সারা পৃথিবী কম্যুনিজমের দীক্ষায় দীক্ষিত হোক।

সমকামের সমথর্করও নিশ্চই চাইবেন যে সবাই তাদের প্রতি সহানুভুতিশীল হোক এবং দিনে দিনে তাদের গোষ্টির সংখ্যা বৃদ্ধি পাক। এবার আগামী সেই দিনগুলির কথা কল্পনা করুন যখন পৃথিবীর আটশো কোটি জনসংখ্যার অধিকাংশই সমকামী… পুরুষ নারীকে নিয়ে, কিম্বা নারী পুরুষকে নিয়ে আর কোন কবিতা রচনা করবে না….চলচ্চিত্রে ধুমশো চেহারার দুজন পুরুষ পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে নাচছে আর গাইছে…. “কানে কানে শুধু একবার বলো ওগো তুমি যে আমার…” একবার ভাবুনতো দৃশ্য -টা ?

৫) বেলাল হোসেন

সমকামিতা স্বাভাবিক মনের বিকাশ নয় -

সমকামিতা নিয়ে এত হৈ চৈ ! সমকামিতা স্বাভাবিক মনের বিকাশ নয়। মেডিক্যাল সায়েন্সে এই বিষয়টি ফোরেন্সিক মেডিসিনের অন্তর্গত। একটি ফ্রেশ কিশোর কিংবা কিশোরী সমকামিতার প্রথম সন্ধান কার কাছে পায়? তার এক বিকৃতকাম সিনিয়রের পাল্লায় পড়ে তার প্রথম অভিজ্ঞতা হয়। এর পর সে যদি সুস্থ সঙ্গ না পেয়ে থাকে, সেও কালক্রমে ঐ পথের পথিক হয়ে পড়ে।

আমি জীবনে এরকম অভিজ্ঞতার মধ্যে দুবার পড়েছি। প্রথম অভিজ্ঞতা আই আই টি হোস্টেলে, র‍্যাগিং পিরিয়ডের সময়। দ্বিতীয় অভিজ্ঞতা, যখন মেডিক্যালে ফার্স্ট ইয়ারে যখন পড়ি । তখন একবার আমার হাত ভেঙে যায়, যে অর্থোপেডিক সার্জেন আমাকে দেখেছিলেন, তিনি কলকাতার একজন স্বনামধন্য ডাক্তার হওয়া সত্ত্বেও আমার সঙ্গে সমকামীদের মত ব্যবহার করেছিলেন; শুধু তাই নয়, জীবনে উন্নতির জন্য গোপনে নিয়মিত সম্পর্ক রাখতে বলেছিলেন। আমার ভাগ্য ভাল, আমি খুব বন্ধুবান্ধব নিয়ে চলতে ভালবাসি, জীবনের কোন অধ্যায়েই কোন গোপনীয়তা প্রায় কিছুই রাখিনি। তাই বেঁচে গিয়েছি। স্বাভাবিক জিনিসের আনন্দ স্বাভাবিক ভাবে নেওয়ার শিক্ষাটা মনের মধ্যে থেকে গিয়েছিল বলে ঐ গোপন জগৎটাকে ঘৃণা করতে পেরেছি।

কলেজ লাইফে শুনেছি, কলকাতার অনেক পার্কে নাকি অনেক অল্পবয়সি ছেলে এভাবে কিছু বিকৃতকাম মধ্যবয়সি পুরুষদের আনন্দ দিয়ে অর্থ উপার্জন করেছে। সেটা যে নিশ্চিন্তভাবে এবং নিশ্চয়ই নোংরা কাজ, তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

ফোরেন্সিক মেডিসিনে সমকামিতা, পশুর সংগে কামে লিপ্ত হওয়া ও সঙ্গীকে ব্যাপক নিপীড়নের মাধ্যমে নিজের কামাবেগ অর্জন করাকে একই অধ্যায়ের অন্তর্ভুক্ত করে পড়ানো হয়, যার সোজাসুজি অর্থ হল, এগুলি অসুস্থ মনের বিকাশ যার চিকিৎসা প্রয়োজন।

আজ যাঁরা এই বিষয়টিকে আধুনিক প্রজন্মের দাবী বলে খুব সায় দিচ্ছেন, তাঁদের বাড়ীর ছেলেমেয়েদের এই রোগ ধরলে খুশি হব। এই নেতাগুলো বরং নিজের ছেলের বিয়ে আরেকজন ছেলের সঙ্গে কিংবা নিজের মেয়ের জীবনসঙ্গী হিসেবে আরেকজন মেয়েকে নির্বাচিত করে একটু পথ দেখাক না! তাদের তো অনেক ধনসম্পত্তি...সেই ব্যাপারটাও আইনানুযায়ী কী করে সামলায় একটু দেখাক ! এই নেতাদের কাজকারবার দেখে সেই পুরোনো গ্রাম্য প্রবাদটা মনে পড়ে যাচ্ছে ...পরের ছেলে পরমানন্দ, যত ভোগে যায়, তত আনন্দ।

অন্ধ পাশ্চাত্য অনুকরণের ফল যা হয় আর কি! তাদের ভাল জিনিসগুলো নেবোনা, বিকৃত জিনিসটা চাই!

সুপ্রীম কোর্ট ঠিক কাজটাই করেছে। বাঁচিয়েছে। ভয় হয়, আবার কোন নতুন বাবু এসে আইনটাকেই না আবার পাল্টে দেয়!!!



বিপক্ষেঃ



১) ঋত্বিক দাশ শর্মা


আমি দুটি মানুষের, একই লিঙ্গ বা বিপরীত লিঙ্গের ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে। আমি মানুষের নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভালবাসার মানুষকে খুঁজে নেওয়ার পক্ষে। আমি দুটি মানুষ উভয়েই দুজনকে ভালবেসে, সুখে একসাথে ভাল থাকার পক্ষে। আমি মানুষের নিজস্ব রিপুর অবধারিত প্রকাশের পক্ষে । আমি প্রাকৃতিক নিয়মে, ভালবাসার হাত ধরে আসা শেষ পর্যায় পর্যন্ত শারীরিক সুখ ও তৃপ্তি অনুভুতির পক্ষে। আমি মানুষের কামজ স্বাধীনতার পক্ষে।

আমি শুধু সন্তান উৎপাদনের জন্যই শারীরিক মিলনের বিপক্ষে। আমি দুটি মানুষের অনৈতিক ব্যভিচারের বিপক্ষে। আমি কামজ কুঅভ্যাসের বিপক্ষে। আমি মানুষের মানসিক অবসাদে বা আদিম রিপুর তাড়নায় কামনার বিকৃত রুচি প্রকাশের বিপক্ষে। আমি একটি মানুষের ভালবাসা ও ভাললাগার দোহাই দিয়ে অন্য প্রাণীর সহিত সহবাসের বিপক্ষে। আমি ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের নামে ভণ্ডামির বিপক্ষে।


২) বৃষ্টি ব্যানার্জী


মাননীয় বিচারক মণ্ডলী ও মোশনের পক্ষের বন্ধুরাঃ

সমকামী, সমকামিতা শব্দগুলি এতই নতুন যে বাংলা অভিধানে এখনও এদের স্থান হয়নি। কিন্তু এই নামের দ্বারা প্রকাশিত মানুষের যে সহজাত চিত্তবৃত্তি, সেটি আদৌ নতুন নয়। ভারতবর্ষের ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাবেন, এদেশে সমকামিতার ইতিহাস বহু পুরানো, Indian culture-এ alredy তাঁরা accepted.

আর তাছাড়া, সমকামিদের সংখ্যা সমাজে অল্প বলেই তাদের অস্তিত্বকে সংকটাপন্ন করতে হবে, এটা কোনো সভ্য সমাজের সিদ্ধান্ত হতে পারে না। আমাদের সমাজে তো transgender-রাও আছেন, তাঁরাও সংখ্যায় লঘু, তাঁরা সমাজের কোন্‌ কাজে লাগেন? তাঁদের তো আমরা মেনে নিয়েছি!! শারীরিক বিশিষ্টতার কারণে যাঁরা লঘু সম্প্রদায় তাঁদের যদি মেনে নিতে পারি, তবে মানসিক বৈশিষ্টগত কারণে যাঁরা সংখ্যালঘু তাঁদের মানতে পারব না কেন?

সবচেয়ে বড় কথা, ‘কাম’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ যেমন যৌন সম্ভোগেচ্ছা, তেমনি, কামনা, অভিলাষ, অনুরাগও বটে। সুতরাং, একটি মানুষের প্রতি অপর একটি মানুষের গভীর অনুরাগও তো থাকতে পারে!! সেটি যদি সমজাতি বা সমলিঙ্গের প্রতি হয়, তাতে বাঁধা কোথায়?

যাঁরা reproduction-কেই যৌনমিলনের একমাত্র উদ্দেশ্য বলে মনে করেন, বন্ধুরা, বলতে বাধ্য হচ্ছি, কেবলমাত্র মনুষ্যতর প্রাণীরাই শুধু reproduction-এর জন্য মিলিত হয়। মানুষের কাছে it is a superlative stage of love making.

সবার আগে ব্যক্তি আমি, আমিই রাষ্ট্রের কারণ এবং উদ্দেশ্য। তাই আমার মৌলিক আধিকার আগে সংরক্ষিত হওয়া প্রয়োজন। নিজের যৌনসঙ্গী নির্বাচন করাও আমার মৌলিক অধিকার গুলির মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান শর্ত। সেখানে সমাজকে reproduction-জাত ফসল দিতে পারব না বলে, আমাকে আমার মৌলিক অধিকার বর্জন করে স্ব-ইচ্ছার গলা টিপে হত্যা করতে হবে, এটা ভারতবর্ষের মতো মহান, উদার, সহনশীল, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

যাঁরা সমকামিতার ক্ষেত্রে এক পক্ষের আনন্দ এবং অন্য পক্ষের শারীরিক নির্যাতন-এই মতের সমর্থক, তাঁদের কাছে জানতে চাই, তাঁরা কি কখনও কোন সমকামীর কাছে জানতে চেয়েছেন, তাঁরা উপভোগ করেন, না কষ্ট পান? নিজস্ব অভিজ্ঞতা বা যথেষ্ট প্রমাণ না থাকলে সিদ্ধান্ত টানা উচিত নয়।

Transgender এবং সমকামী- উভয় ক্ষেত্রেই শারীরিক বা মানসিক বিকৃতির আখ্যা দেওয়া যাবে না। বরঞ্চ শারীরিক ও মানসিক অস্বভাবিকতা বা অসুস্থতা তবু বলা যেতে পারে। কারুর অসুখ করলে সে কি দেশীয় সংস্কৃতির বহির্ভূত হয়ে যায় নাকি???

হাজার হাজার বছর পুরানো ভারতীয় সংস্কৃতিতে সমকামিতা, সহবাস, বিবাহ বিচ্ছেদ, বহুবিবাহ, সতীদাহ, ইত্যাদি সামাজিক প্রথাগুলি আগাগোড়াই ছিল, ইতিহাস ও সাহিত্য তার সাক্ষ্য বহন করে। প্রথাগুলির সামাজিক নামকরণ অপেক্ষাকৃতভাবে অনেকটাই নবীনকালের সংযোজন। বহুবিবাহ বা সতীদাহের মতো প্রথাগুলিকে আমরা সচেতন ভাবে বর্জন করেছি, তার কারণ, প্রথাগুলি সরাসরিভাবে সমাজের ক্ষতি করছিল। কিন্তু, সমকামিতা দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের যৌনসঙ্গী নির্বাচনের পৃষ্ঠপোষণ ছাড়া সমাজের আর কোন প্রত্যক্ষ্য উপকারে লাগে না বলেই তাকে ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী আখ্যা দিতে হবে, এটা অযৌক্তিক। এমন অমানবিক সিদ্ধান্তই বরঞ্চ ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী বলে আমি বিশ্বাস করি।।


৩) স্বপন দেব

যাঁরা এর সপক্ষে বলছেন এবং মাননীয় বিচারক মহোদয়,

আপনারা কোন ভারতীয় সংস্কৃতির কথা বলছেন ? প্রায় ৫০০ বছর মুসলিম ও ২০০ বছর ব্রিটিশ শাসনে থাকা, বহু-বিবাহ, সতীদাহ, বাল্য-বিবাহ, বৃদ্ধ স্বামীর প্রয়াণে কিশোরীর কঠোর বৈধব্য পালন, জন্মভিত্তিক জাত-পাত সমণ্বিত ভারতীয় সংস্কৃতির কথা ? ভারতীয় সংস্কৃতি বলতে আমি বুঝি, সভ্যতার শিখরে থাকা বৈদিক সংস্কৃতি। ভারতীয় সংস্কৃতি বলতে বুঝি, “দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবেনা ফিরে, এই ভারতের মহা-মিলনের সাগরতীরে।”সংস্কৃতি। এর বাইরে,যে সংস্কৃতি মানবিক মূল্যবোধ, মানবিক অধিকার, দুটি মানুষের ভালোবাসার বিরোধী, সেটাই অপসংস্কৃতি।

যৌনতা বিষয়ে ভারতীয় সংস্কৃতি বরাবরই খুব উদার। কোনারক বা খাজুরাহো তে যে মৈথুন মূর্তিগুলি আছে, তাতে সমকামে রত পুরুষ এবং সমকামে রত মহিলা মূর্তি আছে। বাৎস্যায়নের কাম-শাস্ত্রেও সমকামিতার উল্লেখ আছে। সমকামিতা কথা টা নতুন, প্রথাটা কিন্তু বহুদিন ধরেই চালু। বিধবা পুনর্বিবাহ, সমকামিতার থেকে অনেক বেশী আলোড়ন তুলেছিল তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে। ভারতীয় সংস্কৃতি কিন্তু সেটা মেনে নিয়েছে। লিভ-টুগেদার, ডিস্কো-থেক, বিবাহবিচ্ছেদ এ গুলি তো ভারতীয় সংস্কৃতির সাথে দিব্যি খাপ খেয়ে গেছে!

আসলে আপনারা ভারতীয় সংস্কৃতিটাকেই খুব সংকীর্ণ ও ছোট করে দেখছেন। ভারতীয় সংস্কৃতি এতোটাই উদার, এতোটাই সহনশীল যে, যীশুর জন্মদিনে কেক কাটা বা মুসলিম দের ঈদের মত, বিজয়ায় কোলাকুলি করাটা আমাদের সংস্কৃতিতেই ঢুকে গেছে! দুজন অভিন্ন হৃদয় বন্ধুকে দেখে আমরা বলি, “হরি-হর” আত্মা। তো, দুজন পুরুষ বা নারীর যদি আত্মার মিলনে বাধা না থাকে, তবে, যৌন মিলনে বাধা কোথায়...?

আর অধিকার এবং সংস্কৃতি দুটি কিন্তু ভিন্ন বিষয়। নিজের এবং দেশের স্বাধীনতা আমার অধিকার। আমার যৌন-সঙ্গী বেছে নেওয়াটাও আমার মানবাধিকার। আমি আগে মানুষ, পরে ভারতীয় । সংস্কৃতির সঙ্গে এর কোনও যোগ নেই।

আর একটি কথা, মার্ক্সীয় দর্শনে, অর্থনীতি হোল স্ট্রাকচার আর সংস্কৃতি হোল সুপার-স্ট্রাকচার । একটি অপরটির সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে যুক্ত। আপনি অর্থনৈতিক সুবিধার জন্যে গ্লোবালাইজেসন এর দরজা হাট করে খুলে দিয়ে বিদেশী পুঁজি কে স্বাগত জানাবেন আর তার পেছন পেছন আসা বিদেশী সংস্কৃতিকে ঢুকতে দেবেন না , এটা হয় না।


৪) অনুরাধা দাসগুপ্তা

আমি বিচারকের ভূমিকায় না। প্রথমে 377 ধারাটিকে দেখা যাক, 377 states that “whoever voluntarily has carnal intercourse against the order of nature with any man, woman or animal shall be subject to a punishment up to life imprisonment”. এর সঙ্গে সমকামিতার যোগাযোগ দেখিনা, সম্পূর্ণ ভাবে ব্যাক্তিগত। শুধু পুরুষ মহিলার যৌন মিলন সামাজিক, বাকি অসামাজিক এটা মানতে নারাজ। প্রতিটি মানুষের ব্যাক্তিগত স্বাধিনতাকে সন্মান করা উচিত। এটা mental distortion বলা যেতে পারে, তার জন্য medical science improve করার দরকার।



হিজরা যেমন প্রাকৃতিক নিয়মের বহির্ভূত নয়, সমকামিতাও প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে।

What really bugs me the most is that these religionists think they're such an authority on nature. Actually, they know nothing about nature and they are the ones who are completely clueless about nature. They are too brainwashed by their religions of male domination that they don't even try to analyse how and why gays are created.


৫) সুস্মিতা সিং

সভার সপক্ষের বন্ধুরা ও মাননীয় বিচারক মণ্ডলী-

সবার প্রথমে খুব ভাল করে বিতর্কের বিষয়টি কি, তা বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে, প্রশ্নটি ‘আমি মানি কিনা’ নয়, ‘ভারতীয় সংস্কৃতি মানে কিনা’। আসুন দেখে নেওয়া যাক, ভারতীয় সংস্কৃতিতে তথা ইতিহাস ও সাহিত্যে সমকামিতার স্থান কোথায়।।

ভারতীয় সংস্কৃতি সমকামিতার পরিপন্থী – এ কথা মেনে নিতে গেলে ভারতীয় সংস্কৃতির মূল আধার বৈদিক পুরাণ সাহিত্য এবং সমকালীন ইতিহাসকে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হতে হয়। অনেকানেক কাহিনীর মধ্যে বিতর্কের এই স্বল্প পরিসরে মাত্র কয়েকটি উদহরণ উপস্থাপিত করা গেল। পুরাণ মতে, দেবী পার্বতী ও গজাননা রাক্ষসী নামে দুই নারী গনেশের জন্ম দেন। কৃত্তিবাসী রামায়ণে সূর্যবংশীয় রাজা দিলীপের অপুত্রক দুই বিধবা স্ত্রী মহাদেবের আদেশে সমকামে লিপ্ত হয়ে জন্ম দেন পুত্র ভগীরথের। ঋগ্বেদের বহু কাহিনীতেও নারী সমকামিতার চিত্র পাওয়া যায়। আবার মহাভারতে শিখণ্ডিনী প্রথম জীবনে ছিলেন নারী, তা সত্ত্বেও এক নারীর সঙ্গেই তাঁর বিবাহ হয়। এই মহাভারতেই দেখি, স্বাহার পতি অগ্নির সঙ্গে সোমদেবতার সমকামী সম্পর্ক ছিল। বৈদিক সাহিত্য ও মহাভারতের দুই দেবতা মিত্র ও বরুণ-এর মধ্যে গভীর সমকামের সম্পর্কের উল্লেখ পাই। ভাগবত পুরাণ মতে, এই মিত্র ও বরুণ অযোনিজ কামে লিপ্ত হয়ে বাল্মিকী ও অগ্যস্ত নামে দুই পুত্রের জন্ম দেন। সুশ্রুত সংহিতাতেও পুরুষ সমকামীদের কথা পাওয়া যায়। বাৎস্যায়নের কামসূত্রেও সমকামিতার উল্লেখ রয়েছে, পরবর্তীকালে যার প্রত্যক্ষ প্রক্ষেপণ আমরা লক্ষ্য করি খাজুরাহ ও কোণারকের মন্দির গাত্রে।

দক্ষিণ ভারতে একেবারে আদিকাল থেকে ‘জোগাপ্পা’ নামে এক সম্প্রদায় আছে, যাঁদের পেশা গণিকাবৃত্তি। এঁদের এবং দক্ষিণ ভারতীয় দেবদাসীদের একটা বড় অংশ সমকামী। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের কিছুটা আগে কাশীর বিধবা মহিলাদের মধ্যে সমকামিতা ভারতীয় সমাজে যথেষ্ট আলোড়ন তুলেছিল, ইতিহাস যার নীরব সাক্ষী। সহনশীল ভারতীয় সংস্কৃতিতে মানুষের সহজাত প্রতিটি প্রবৃত্তিকেই সমান মর্যাদায় ইতিহাস ও সমকালীন সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা দেওয়া হয়েছে অকুণ্ঠিত ভাবে।

সুমহান ভারতের ‘সংস্কৃত’ ইতিবৃত্ত আমার আপনার সহমতের অপেক্ষা না রেখেই সমকামিতাকে নির্দ্বিধায় স্বীকৃতি দিয়েছে একেবার আদি থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত। অতএব, বন্ধুরা, গর্বিত ভারতবাসী হিসাবে মানবিক ও মানসিক ঔদার্য্য খর্ব করার সংকীর্নতাকে প্রশ্রয় না দেওয়ার মধ্যেই সার্বিক আত্মিক উত্তরণ প্রতিষ্ঠিত হয় বলেই আমি মত পোষণ করি।।